দেশটাকে পরিষ্কার করি

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:০৫
একদিকে নতুন বছরকে বরণ করার আনন্দ আর উত্সাহ, অন্য দিকে ফেলে আসা বছরের সব আবর্জনা, অমঙ্গলকে ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় আর বার্তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৈশাখ নিয়ে লেখা অমর গানটিতে ফুটে ওঠেছে পরিষ্কারভাবে। প্রতি বছর প্রধানত এই গানটি দিয়েই আমরা নতুন বছরকে বরণ করে নিই। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি আসলেই পুরাতন বছরের সব আবর্জনা, মনের লোভ-লালসাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরে পা দিতে পারি? এইবার পহেলা বৈশাখে একটু ভিন্নতা নিয়েই যেন সেই কথাটাই ইঙ্গিত করেছে। পরিবর্তন চাই নামক একটি সংগঠন ‘দেশটাকে পরিষ্কার করি’ স্লোগানে বুকে ঝাড়ু আঁকা লাল-সাদা টি-শার্ট গায়ে চড়িয়ে ২৫০-এর অধিক সেচ্ছাসেবকের দল নিয়ে ঝাড়ু হাতে ভোর ৬টা থেকে শুরু করে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০টি দলে ভাগ হয়ে অংশগ্রহণ করেছিল পরিচ্ছন্নতার কর্মসূচিতে। ‘পরিবর্তন চাই’-এর সাথে এই কর্মসূচির সহযোগী হিসেবে ছিল বাপা, সবুজপাতা, গ্রিন ভয়েস, মাস্তুল, প্রাক্তন ক্যাডেট ফোরাম, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ আরও অনেকগুলো সংগঠন। এই কার্যক্রমের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল পহেলা বৈশাখে বহুল প্রচলিত ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতির প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ‘পরিবর্তন চাই’-এর ‘দেশটাকে পরিষ্কার করি’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী ২৫০-এর অধিক স্বেচ্ছাসেবীর খাবার তালিকা থেকে ইলিশকে বাদ দিয়েছিল। যেহেতু এখন ইলিশের মৌসুম নয়, আর ডিমসহ ইলিশ নিধন ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে, তাই ‘পরিবর্তন চাই’ ইলিশ মাছের পরিবর্তে রুই মাছ ভাজা আর নানা প্রকার দেশীয় ভর্তা দিয়ে এইবারের পহেলা বৈশাখের খাবারের আয়োজন করেছে এবং সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করেছে এই দিনটিতে ইলিশ সহযোগে উত্সব করার বিপক্ষে। ভিন্নতা শুধু ইলিশ বাদ রেখে তৈরি করা খাবারেই ছিল না, ভিন্নতা চোখে পড়েছে কর্মসূচিজুড়েই। নিজ উদ্যোগে আর প্রচেষ্টায় আবর্জনা পরিষ্কারের চেষ্টাটিও ভিন্ন ছিল। আমাদের দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পহেলা বৈশাখে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর নানা ধরনের বিজ্ঞাপন দূষণ করে থাকে। কাগজের হাত পাখা, কাগজের টুপিসহ নানা জিনিসে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের এবং পণ্যের বিজ্ঞাপন ছেপে প্রচারের উদ্দেশ্যে উত্সবে আসা মানুষের হাতে তারা এসব বিলি করে থাকে। এতে করে পরিবেশের ক্ষতি হয়। সাথে আরো যোগ হয় উত্সবে আসা মানুষের খাবার আর নানাপ্রকার উচ্ছিষ্ট। ‘পরিবর্তন চাই’ নিজেদের উদ্যোগে এই আবর্জনা পরিষ্কার করতে ১০টি দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন জায়গাজুড়ে স্থাপন করেছে ১০০টি ডাস্ট বিন। ছয় ঘণ্টা সময় ধরে ‘পরিবর্তন চাই’-এর প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবী আপ্রাণ চেষ্টা করেছে উত্সবে আসা মানুষদের নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার ব্যাপারে সচেতন করতে, উত্সাহী করতে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পুরো কাজটিই সম্পন্ন হয়েছে কোনোপ্রকার বিজ্ঞাপন আয় ছাড়াই। সম্পূর্ণভাবে ‘পরিবর্তন চাই’-এর সদস্যদের ও সাধারণ মানুষদের অনুদান ও স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজনটি সম্পন্ন হয়। ‘পরিবর্তন চাই’-এর নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিটিতে অংশগ্রহণ করেন আনন্দ আর উত্সবের আমেজে। ‘পরিবর্তন চাই’-এর প্রধান সমন্বয়ক ফিদা হক জানান, ‘দেশটাকে পরিষ্কার করি’ ইভেন্টের মাধ্যমে আমরা মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি অন্যায় আর বদভ্যাসের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগাতে সক্ষম হয়েছি। আমরা দেশবাসীকে আহ্বান জানাই; যার যার আশপাশের এলাকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভবন, জলাধার, পার্কসহ সমস্ত জায়গা, যে সমস্ত জায়গা আমরাই ব্যবহার করি। সেই সমস্ত জায়গাগুলো যদি আমরা নিজেরাই সম্মিলিতভাবে মাসের একটা নির্দিষ্ট দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার অভ্যাস করি তাহলে আমরা নিজেরাই পারি আমাদের পরিবেশকে সকলের বসবাস উপযুক্ত করতে।’ ভবিষ্যতেও “পরিবর্তন চাই” এমন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এর পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক সহ আরও নানাবিধ অসঙ্গতি নিয়ে কাজ করে যাবে বলে কথা দিচ্ছি। সকল অন্যায়, অসুন্দর, আবর্জনার বিরেদ্ধে আমাদের সত্য, সুন্দর আর পরিচ্ছন্নতার আন্দোলন চলমান থাকবে।