বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডাকাতির খবর প্রায়শ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। পাশাপাশি মাঝে মাঝে জলদস্যু ধরা পড়ারও খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ডাকাতি বন্ধ হচ্ছে না। গণপিটুনিতে একের পর এক জলদস্যু মরছে, সহযোগীরাও কেউ কেউ ধরা পড়ছে। তারপরও যদি জলদস্যুর উপদ্রব বন্ধ না হয়ে গণডাকাতি অব্যাহত থাকে তা হলে তো সরকারের চেয়ে জলদস্যুদের দাপট বেশি বলে প্রতীয়মান হয়।
বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষা বিভিন্ন চ্যানেলে জলদস্যুদের উত্পাত সীমা অতিক্রম করেছে। বঙ্গোপসাগর জলদস্যুদের সাগরে পরিণত হতে চলেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, মহেশখালী, সোনাদিয়া, গণ্ডামারা, মহীপুর ও কুতুবদিয়াসহ ১৫টি চ্যানেলে প্রতিদিন সংঘটিত হচ্ছে একের পর এক ডাকাতি। গত তিন বছরে এসব চ্যানেলে জলদস্যুদের হাতে খুন হয়েছেন শতাধিক জেলে। আহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০০। স্থানীয় প্রশাসন ও অসাধু রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় জলদস্যুরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। মত্স্যজীবী ও ট্রলার মালিকদের অভিযোগ—চট্টগ্রামের ১৫ থেকে ২০টি চ্যানেলে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০টি ট্রলারে ডাকাতি হয়। গত তিন বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন চ্যানেলে কমপক্ষে তিন হাজার ডাকাতি হয়েছে। এ সময় জলদস্যুদের হামলায় হতাহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬০০ জেলে। জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ট্রলার ও মাছ লুট, হত্যাসহ নানা অপকর্ম করছে এই পেশাদার অপরাধীরা। সাগরের বিভিন্ন চ্যানেলে সক্রিয় রয়েছে জলদস্যুদের ১১টি গ্রুপ।
র্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে কখনো কখনো জলদস্যুদের ওপর আঘাত হানা হলেও কার্যত এ দুর্বৃত্তদের সামাল দেওয়ার আর কোনো উদ্যোগ নেই। জলদস্যুদের কারণে বঙ্গোপসাগর উপকূল নিরাপত্তাহীন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে, উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুদের অপতত্পরতা বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোথাও জলদস্যুদের তত্পরতা থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এজন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতে হবে। গোয়েন্দা তত্পরতার মাধ্যমে জলদস্যুতার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের গ্রেফতারের উদ্যোগ নিতে হবে। জলদস্যুদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া দরকার।
জলদস্যুরা শুধু সমুদ্র থেকে ধরা ট্রলারের মাছ ডাকাতি করে না, তারা জাল, ট্রলারের মেশিনের যন্ত্রাংশসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এমন কি কখনও কখনও তারা মালামালসহ ট্রলারটিও নিয়ে যায় ট্রলারের মাঝিমাল্লা ও জেলেদের সাগরে ফেলে দিয়ে। জলদস্যুদের এমন দুর্ধর্ষ অভিযান যদি চলতে থাকে তাহলে তো সমুদ্রে মাছ ধরাও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে। প্রাণের ভয়ে জেলেরা মাছ ধরতে যাবেন না। তাঁরা ক্রমে এ পেশাই ছেড়ে দেবেন। তখন মাছে ভাতে বাঙালির কী দশা হবে !
তাছাড়া সামুদ্রিক মাছ আমাদের দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। কেবল সামুদ্রিক মাছ নয় মাছের আঁশ ও পেটের ফাত্নাসহ মত্স্যজাত বহুকিছু বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যসামগ্রীতে স্থান পেয়েছে। ফ্রোজেন ফুডস-এর ব্যবসার মাধ্যমে বেশকিছু পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হচ্ছে। এ অবস্থায় যদি বঙ্গোপসাগরের মত্স্য সম্পদ জলদস্যুদের হামলায় আহরণ করা না যায় তাহলে তার বিরূপ প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির ওপরেও পড়বে। স্বাভাবিকভাবে জলদস্যুদের দমন করার ব্যাপারে সরকারের কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।
মনে রাখা দরকার জলদস্যুরা যথেষ্ট সংঘবদ্ধ। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেও তারা উপকূলরক্ষী বাহিনী বা কোস্টগার্ড বাহিনীর চেয়ে যথেষ্ট বলীয়ান ও সুসজ্জিত। কাজেই কোস্ট গার্ড বাহিনীকে জনবলসহ সব দিক থেকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
ঢাকা
