নেশার ছোবল

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৮
মাদক নেশার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে দেশের যুব সমাজ। গত বছর এ মরণ নেশার উন্মত্ত শিকার হয়েছে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর ও তার স্ত্রী। ইয়াবা আসক্ত অষ্টাদশী মেয়ে ও তার বন্ধুদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাঁরা। বাবা-মা মাদকাসক্ত মেয়ের ওপর খবরদারি জোরদার করায় সে তার বন্ধুদের নিয়ে তাঁদের হত্যা করার পরিকল্পনা আঁটে। এজন্য খাবারের মধ্যে চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে তাঁরা যখন অঘোর ঘুমে ঘুমাচ্ছিলেন তখন ছুরিকাঘাতে তাঁদের হত্যা করা হয়। হত্যার পর বাড়ি থেকে টাকা ও গহনা নিয়ে পালিয়ে যায় মাদকাসক্ত মেয়ে। পরে সে নিজেই ধরা দেয় পুলিশের হাতে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন এখন দেশের নেশার জগতে পরিচিত নাম। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী এসব মাদকে আসক্ত। সীমান্ত ডিঙিয়ে এসব মাদক দেশে আসছে নানা হাত ঘুরে। আশির দশকে এদেশে হেরোইনের আগ্রাসন ঘটে। এ দশকের শেষের দিকে ফেনসিডিল মাদক রাজ্যের পরিচালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে ইয়াবার আগমন ঘটে মাদকরাজ্যে। প্রথমদিকে এ আগ্রাসনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন ইয়াবার থাবায় আক্রান্ত দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকা। রাজধানীর অভিজাত তরুণ-তরুণীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইয়াবায় আসক্ত। এ নেশার অর্থ জোগাতে তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। এ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী। অভিজাত এলাকার ক্লাব, রেস্তোরাঁ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদকের নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ মাদক নেশায় তাত্ক্ষণিকভাবে হূত্স্পন্দন, রক্তচাপ ও শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। মস্তিষ্কের কিছু কোষের অপমৃত্যু ঘটে। এভাবেই হূিপণ্ড এবং ফুসফুস ও কিডনি বিকলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ইয়াবা আসক্তরা। এ মরণ নেশা প্রতিরোধে সীমান্তে কড়াকড়ি প্রহরার ব্যবস্থা করা দরকার। আমাদের যুব সমাজের প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনা দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। তারুণ্যের শক্তি যেমন দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে পারে, ঠিক তেমনি এর উলটোটি দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতির কারণও হতে পারে। যে কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি যুব সমাজের আসক্তি তার প্রাণশক্তিকে অকালে নষ্ট করার পাশাপাশি তাকে অসামাজিক ও ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে তাড়িত করে এবং ক্রমে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করায়। তরুণ সমাজের একটি অংশ যৌন উত্তেজক ওষুধ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের পাশাপাশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের আপলোডের মাধ্যমে পর্ণোগ্রাফিতেও আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে দিনকে দিন ইভটিজিং, অপহরণ, ধর্ষণ, খুন, গুম ও অপমৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে। নেশার ছোবলে যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। রাজধানী ঢাকাসহ মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে হেরোইন, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ সব ধরনের নেশাদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এনার্জি ড্রিংকস ও ফুড সাপ্লিমেন্টের নামে মানব জীবন বিনাশী ড্রিংকস তৈরি ও বিপণন বন্ধে সরকার, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ কেন ব্যর্থ হবে? দেশের যুব সমাজকে সর্বনাশা নেশার ছোবল থেকে রক্ষায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কি কোনো দায়-দায়িত্ব নেই? মানবজীবন বিনাশী মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত রাখতে হলে কঠোর আইন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ যেমন জরুরি তেমনি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও দরকার। মাদক সংক্রান্ত যেসব আইন আছে সেসব আইনকে বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যথেষ্ট বলে মনে হয় না। আইনে শাস্তির ব্যবস্থা আরো কঠোর করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে মাদকের মামলার বিচার যাতে খুব দ্রুত হয় তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাদকের মামলার আসামিরা যাতে সহজে জামিন পেতে না পারে সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। আর বাবা-মাকে লক্ষ রাখতে হবে—সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে। মাদক গ্রহণ করছে কিনা? মাদকের সঙ্গে জড়িতরা যত ক্ষমতাশালীই হোক না কেন, তাদের সবাইকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের পরিহার করতে হবে। পুলিশের কাজ, আইন ও বিচার সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অন্যথায় দেশ ও সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা যাবে না। ঢাকা