এম মুনতাসির আলম। এই প্রজন্মের একজন কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে সাফল্যের উচ্চশিখরে নিয়ে গেছেন। বর্তমানে দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পিড অ্যাডভার্টাইজিংয়ের
সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে সফল এই গুণী মানুষটিকে নিয়ে আমাদের এবারের প্রজন্মের আইকন। তাকে নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
স্বপ্নের সাথে সাধনা যোগ হলে রচিত হয় সাফল্যের গল্প। তবে সেই গল্পটার পেছনে থাকে অনেক শ্রম ও সময়ের সাথে চলার অভিজ্ঞতাও। কর্পোরেট এরিনায় কাজ শুরুর গল্প জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে আমাদের সামনে মেলে ধরেন তার গল্পের ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘আমার শুরুর গল্পটা খুবই সাধারণ। ইউনিভার্সিটিতে থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় আমারই এক ক্লাস মেট জিজ্ঞেস করল, আমি পার্টটাইম চাকরি করতে চাই কি না। তার বড় ভাই ইউনিট্রেন্ডে চাকরি করেন। তো সেই সূত্রেই আমার প্রথম পরিচয় অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মের সাথে। আমার প্রথম বস হলেন জাফর খান। তিনি এখন বিদেশে থাকেন। তো ওখানে পার্ট টাইম কাজ করতে করতে ছাত্র অবস্থায় তিনি একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ফুলটাইম চাকরি করতে আগ্রহী কি না। রাজি হয়ে গেলাম। কাজের নেশা ছিল, ভালো লাগত। অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে আমি ইভেন্টে কাজ করতাম বেশি। এবং সেখান থেকে কাজের শুরু বলা যায়। ইউনিভার্সিটি শেষ করার পর অন্যদের মতো আমাকে আর চাকরি খোঁজা লাগেনি। ইউনিট্রেন্ড ছাড়ার পর ২০০৭ সালে ১৫ জানুয়ারি ইন্টারস্পিডে জয়েন করি। শুরুর দিকে আমি ইভেন্ট ডিজাইন করে ক্লায়েন্টদের দেখাতাম। তাদের জন্য প্রেজেন্টেশন তৈরি করে যখন কালারগুলো ম্যাচ করতাম, দিন শেষে ইভেন্টের সময় যখন নিজে এক্সিকিউশনে বসতাম, কনসার্ট ও ইভেন্ট করতাম, লাইটস অ্যারেঞ্জ করতাম—এগুলোই আমার মধ্যে অন্য এক বোধের জন্ম দেয়। তখন মনে হতো, এটাই আমার উপযুক্ত পেশার ক্ষেত্র। আমার টার্নিং পয়েন্টটা হলো—সেই ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি। প্রথম ইন্টারস্পিডে চাকরি শুরু করলাম। এখন আমার কাজের পরিধিটা খুবই বড়। এখানে আমাদের ট্রেডিশনাল ক্রিয়েটিভ কাজগুলো করতে হয়, ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিগুলো করতে হয়, ক্যাম্পেইনের ক্রিয়েটিভ ডিজাইন, কনসেপ্টস, আইডিয়াস টেলিভিশন অ্যাড স্টোরি, মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট—সর্বোপরি পাবলিক অ্যাডভাইর্জিং করতে হয়। ইন্টারস্পিডের টোটাল চারটি প্রতিষ্ঠান আমাকে দেখাশোনা করতে হয়।’ ক্যারিয়ারের সেরা কাজগুলো কথা জানতে চাইলে এম মুনতাসির আলম বলেন, ‘আমার সাড়ে বারো বছরের ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে, আড়ং বাংলাদেশ ফ্যাশন উইক (২০০৪), ইউনিলিভারের বেশ কিছু কাজ, এয়ারটেল, সিটিসেলের বেশ কিছু প্রমোশন। আর দেশের বাইরে আমি অনেকগুলো শো করেছি। যেমন—সাউথ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, ভারত প্রভৃতি।’ নতুন প্রজন্মের কাজকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন এবং তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম আমাদের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে। কারণ আমরা যখন পড়াশোনা করেছি তখন ইন্টারনেট কানেকশন বা স্মার্টফোন ছিল না। যা ছিল তাও অনেক ব্যয়বহুল। ফলে আমাদের সময়-সুযোগ কম ছিল। কিন্তু বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম সহজেই অনেক বেশি ইনফরমেশন জানতে পারে, মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে। তবে বর্তমান প্রজন্ম একটু বেশি অধৈর্য। আমি তরুণ প্রজন্মকে বলব অর্থের পিছনে না ছুটে কর্মের পিছনে ছুটো। আর তাহলেই অর্থই তোমার পিছনে দৌড়াবে।’ আপনার আইকন কে? দেশে কাদের কাজ আপনার ভালো লাগে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার আইকন যিনি তাকে আমি কখনও দেখিনি। আমার আইকন এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। তাকে আমরা এই দেশের ফাদার অব অ্যাডভার্টাইজিং বলি। তার কাজ আমাকে মুগ্ধ করে। তার একটা প্রতিচ্ছবি আমি দেখি আমাদের স্যার শারজিল করিমের মধ্যে, তিনি তার বড় ছেলেও বটে। বলতে পারেন আমার আইকন শারজিল করিম।’ নিজের কাজকে কখন সফল ও সার্থক মনে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিজেকে তখনই সফল ও সার্থক মনে হয়, যখন ক্লায়েন্ট খুশি হয়ে জানায় কাজটি ভালো হয়েছে।’ আপনার শৈশব-কৈশোর ও পরিবারের কথা জানতে চাই। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার শৈশবের অনেকটা এবং কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে চা-বাগানে। আমার বাবা চা বাগানে কর্মরত ছিলেন এবং এখনও তা-ই আছেন। আমার শৈশবটা ছিল সবুজের সাথে বাস করা। অনেক অনেক ডানপিটে, গাছে চড়া, সাইকেল চালানো, লেকে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা এসব নিয়েই কাটছে। যেটা শহুরে জীবনে অনেক অনেক মিস করি। কৈশোর কেটেছে কিছুটা চা-বাগানে, কিছুটা ঢাকা শহরে। আমার মা গৃহিণী, ঢাকাতেই থাকেন। আমার একটা বোন আছে। সে লন্ডনে থাকেন তার স্বামীর সাথে। আমার একটা ভাগ্নি আছে ২ বছর বয়স। এ ছাড়া আমার স্ত্রী কর্মজীবী। তার সাথে আমার পরিচয় আজ থেকে ৫ বছর আগে। আমার সংসার সাড়ে তিন-চার বছর হচ্ছে। কর্মজীবনের বাইরে আমার কাজের বাইরে পুরোটা সময় কাটে আমার স্ত্রীর সাথে। অবসর সময় কাটে ঘোরাঘুরি করে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হচ্ছে ইরান। যদিও জানি না, কীভাবে যাব!’ আপনার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের এখনও নির্দিষ্ট নয়, তবে কোনো একটা সময় কোনো একটা স্টেজে গিয়ে শিক্ষকতা করতে চাই। আমি শিক্ষকতা করতে চাই ইনফরমেশন ও অ্যাডভার্টাইজিং নিয়ে।’
এম মুনতাসির আলম
মা :শাহীনুর আলম
বাবা :এম নুরুল আলম
স্ত্রী :রেজওয়ানা চৌধুরী
প্রথম স্কুল :সেন্ট যোসেফ হাই স্কুল
প্রিয় পোশাক :স্যুট ও পাঞ্জাবি-পায়জামা
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে ও স্ত্রীর সাথে ভ্রমণে
সাফল্যের সংজ্ঞা :লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই।
