প্রজন্ম মুখ

ফ্রেমে বাঁধেন গুণীর মুখ

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৪
বাড়ি ছেড়েছেন ছবি তোলায় নেশায়। ছবি তোলা তার কাছে শুধু ছবি তোলা নয়, তিনি ছবি তোলাকে শিল্প মনে করেন। তিনি ক্যামেরার ফ্রেমকে মনে করেন আলোকচিত্রীর ক্যানভাস। যারা দেশের জন্য কাজ করছেন তাদেরকে ছবির ক্যানভাসে আটকে রাখেন তিনি। এ যেন তার নেশা। এই মানুষটির নাম ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি। তার জীবন, কাজ ও কাজের উদ্দেশ্যসহ নানা বিষয়ে নিয়ে লিখেছেন আহসান রনি বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। সেই সুবাদে দেশের নানা স্থানে গিয়ে নানা ধরনের মানুষ দেখেছেন তিনি। এসব মুখকে ক্যামেরাবন্দী করার ইচ্ছা জাগত তার। মানুষের নানা এক্সপ্রেশনের ছবি তাকে খুবই আকর্ষণ করত। তাই তো মামা কবি কামরুল হাসান যেদিন তাকে একটা ছোট ক্যামেরা কিনে দিলেন সেদিন থেকে তার ছবি তোলার অভিযান শুরু। তিনি ফটোগ্রাফার নাসির আলী মামুনের তোলা ছবি দেখে খুবই অনুপ্রাণিত হতেন। মামুনের তোলার দেশবরেণ্য মানুষদের ছবি দেখে স্বপ্ন দেখতেন তার মতো ছবি তোলার। উচ্চমাধ্যমিকের পর তাই আর পড়াশোনা করেননি তিনি। নিজেকে উত্সর্গ করেছেন ছবি তোলার জগতে। পরিবারের বেশিরভাগ মানুষ তার এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু ছবি তোলা অন্তপ্রাণ মানুষটিকে দমিয়ে রাখা যায়নি। বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের কাজ করেছেন। ক্যামেরাই তার জীবনধারার প্রধান বস্তু এবং দেশবরেণ্য ব্যক্তিদেরকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করা তার কাজ। গত প্রায় বিশ বছর তার ক্যামেরা এড়ায়নি এদেশের কোনো শিল্পমগ্ন মানুষের মুখ। রাজনীতিবিদ থেকে সৃজনশীল সমাজকর্মী, চিন্তাবিদ থেকে অর্থনীতিবিদ; দেশের জন্য যারা কাজ করছেন প্রত্যকের ছবি তোলেন ইফতি। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি তোলা তার নিজের কাছেও প্রিয় বিষয়। তাছাড়া যেখানেই শিল্পীদের অস্তিত্ব সেখানেই আছে ইফতি আর তার ক্যামেরা। তিনি ছবি তোলেন বিখ্যাত সেসব মানুষের যারা দেশের গুণীজন। সবাই যাদের সম্পর্কে জানে, যাদেরকে সম্মানের চোখে দেখে। যাদের অনেকই এদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্রষ্টা। তিনি সেসব মানুষদের ছবি তোলেন যাদেরকে জাতি মনে রাখবে তাদের মৃত্যুর পরও। প্রতিটি মানুষের ছবিই তাদেরকে সকলের সামনে রাখে। ইফতির এসব ছবি তোলার উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের যারা বিখ্যাত মানুষ তাদেরকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। বর্তমানে যারা বিখ্যাত তারা একসময় আর থাকবেন না। কিন্তু থাকবে তাদের ছবি। এসব ছবিই মনে করিয়ে দেবে তাদের নাম। ১৯৯৫ সালের দিকে বেগ আর্ট ফটো ইনস্টিটিউশন থেকে ফটোগ্রাফির বেসিক কোর্স করেন। এছাড়া সেভাবে কারো কাছ থেকে শেখেননি তিনি। তবে বিখ্যাত মানুষদেরকে ফ্রেমবন্দি করে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই তার কাজের উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রথম দিকে এই কাজটি সহজ ছিল না। অনেকেই ছবি তুলতে চাইতেন না। কিন্তু যারা রাজি হতেন তাদের ছবি তুলে থাকেন তিনি। এই কাজে কেউ তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেনি। তাই বিভিন্ন ইভেন্টে ছবি তুলে টাকা আয় করে ছবি তোলার জন্য ফিল্ম কিনতেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সময় বদলাতে থাকে। তিনি তার ভালো কাজের সমাদর পেতে থাকেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তার তোলা ছবি ছাপানো শুরু হয়। ২০০১ সালে কাকরাইলের গাজী ভবনে তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। যেখানে ঘরোয়া পরিবেশে ৫০জন বিখ্যাত মানুষের ছবি ছিল। তিনি সাড়া পেতে থাকেন দর্শক মহল থেকে। পরবর্তীতে তিনি আরও কয়েকটি প্রদর্শনী করেছেন, যেখানে তার তোলা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শক। ২০০৬-০৭ সালের দিকে তিনি শায়খ সিরাজের ‘মাটি ও মানুষ’ টিমের সাথে কাজ করার সুযোগ পান। প্রায় ২-৩ বছর শায়খ সিরাজের সাথে কাজ করা অবস্থায় তিনি তার অনেকগুলো ছবি তুলেছেন। সেই ছবির মধ্য থেকে ৫২টি ছবি নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো একজন নির্দিষ্ট মানুষকে নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন তিনি। এই প্রদর্শনীর পরও তিনি ব্যাপক সাড়া পান। এরপরই তার মাথায় পরিকল্পনা আসে কোনো একজন শিল্পীকে নিয়ে কাজ করার কথা। সবার মধ্য থেকে তিনি বেছে নেন প্রবাসী শিল্পী শাহাবুদ্দিনকে। ইফতি নিজেই জায়গা করে নিয়েছেন শাহাবুদ্দিনের কাজ ও চলাফেরার সঙ্গী হিসেবে। তিনি যখনই প্যারিস থেকে ঢাকায়, তখনই খবর পেয়ে ইফতি ছুটেছেন তার সঙ্গে। এই শিল্পীর জীবন ও কাজভিত্তিক একটি প্রদর্শনী করেছেন তিনি ২০১৩ সালে। নাম ‘শাহাবুদ্দিন :দ্য পেইন্টার, দ্য ফাইটার’। সকলে তার কাজকে গ্রহণ করেছেন এবং প্রশংসা করেছেন তার ছবির। তিনি জানালেন, বর্তমানে ফটোগ্রাফি করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে এবং এটি একটি সম্ভাবনাময়ী পেশা। তাই যারা তরুণ প্রজন্ম আছে তারা তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানে নির্দ্বিধায় এই পেশায় আসতে পারেন। প্রজন্মের প্রতি পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যে কাজই করুক না কেন প্রত্যেকের উচিত তার কাজ সিরিয়াসলি করা। হতাশ না হয়ে হতাশাকে শক্তি বানিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়।’ তার স্বপ্ন এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেখানে দেশের গুণী মানুষেরা একসাথে হওয়ার সুযোগ পাবেন। দেশের সর্বস্তরের গুণী মানুষদের ছবিসমৃদ্ধ একটি জাদুঘর করার ইচ্ছা আছে তার। তার আশা কিছু স্বার্থহীন মানুষ তার এই উদ্যোগটিকে সফল করতে এগিয়ে আসবে। এই আলোকচিত্রী কাজ করে যাচ্ছেন দেশের সবচেয়ে মূল্যবান ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত মানুষদের নিয়ে। এসব মানুষদেরকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু তিনি তার এই কাজের জন্য আর্থিকভাবে খুব কম মানুষের সাহায্য পেয়েছেন। তার আফসোস, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি তুলে নিজ উদ্যোগে সেটি তিনি যখন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না কেউ। তিনি আশা করেন দেশের প্রকৃত বীরদেরকে তরুণ প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তার এই উদ্যোগে তিনি সকলকে পাশে পাবেন। ‘প্রজন্ম’-এর পক্ষ থেকে এই দেশপ্রেমী ফটোগ্রাফারের প্রতি শুভকামনা।