রিজওয়ানা হাসানকে সৌভাগ্যবতীই বলতে হয়। মাত্র ৩৫ ঘণ্টার দুঃসহ অপেক্ষাতেই তিনি স্বামীকে ফিরে পেলেন। তাহসিনা রুশদী প্রহর গুনছেন দুই বছর, স্বামী ইলিয়াস আলীর জন্য। আরেক বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের স্ত্রী পথ চেয়ে আছেন চার বছর। স্বামীকে ফিরে পাওয়া দূরে থাক—তাঁদের টিকির হদিসও এখনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিতে পারেনি। এভাবে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ৩৯ জন অপহরণের শিকার হয়। তার মধ্যে ২৩ জন এখনো নিখোঁজ। লাশ হয়ে ফিরেছে ১২ জন। একইভাবে ২০১৩ সালে অপহূত হয় ৬৮ জন। ৫৫ জন এখনো গায়েব। লাশ হয়ে ফিরেছে ৫ জন। ২০১২ সালে অপহূত হয় ৫৬ জন। সেখানে ৩৪ জন এখনো লাপাত্তা। ২০১১ সালে অপহূতের সংখ্যা ৫৯ জন। নিখোঁজ ৩৯, লাশ ১৬। ২০১০ সালে অপহূত ৪৬ জনের মধ্যে এখনো ৩৩ জনের খোঁজ নেই। ২০০৭-২০০৯ সালে ২১ জন অপহূতের মধ্যে লাশ মিলেছে মাত্র ৩ জনের (সূত্র: আইন ও সালিস কেন্দ্র) । এই তালিকায় আবু বকর সিদ্দিকও নাম লেখাতে পারতেন। কারণ এদেশে অপহরণ মানেই যেন হয় গুম, নাহয় লাশ! আবু বকর সিদ্দিক গুম হতে পারতেন। লাশ হয়ে ফিরতে পারতেন। কিন্তু তিনি ফিরলেন অক্ষত অবস্থায়। হোক না ৩৫ ঘণ্টা পর। ফিরেছেন তো! এতটুকু সৌভাগ্যও, এই পোড়া দেশে কয় জনের হয়? এই সৌভাগ্যের কারণ হিসেবে রিজওয়ানা অবশ্য গণমাধ্যমের চাপ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতার কথা বলেছেন। রিজওয়ানা রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেই হয়তো রাষ্ট্রযন্ত্রের এতটুকু সক্রিয়তা ও সহযোগিতা পেয়েছেন। কিংবা অপহরণকারীরা পারিপার্শ্বিক চাপে ভীত হয়ে আবু বকরকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে উপায় কী? তাদের অপহরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের এ সক্রিয়তা ও সহযোগিতার প্রাপ্যতা কতটুকু? তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তত্পর হলেই যে অপহূতরা উদ্ধার হচ্ছে তা কিন্তু নয়। ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য দৃশ্যত কম চেষ্টা হয়নি। কিন্তু অপহরণের ২ বছর পরও উদ্ধার দূরে থাক, তিনি জীবিত না মৃত—এই তথ্যও কেউ জানে না। এটা রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ান্ত ব্যর্থতা ছাড়া কিছু নয়।
জীবন ও শরীরের নিরাপত্তা কেবল নাগরিক অধিকার নয়, এটা আদিতম মানবাধিকার ও সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ জানাচ্ছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। ৩১ অনুচ্ছেদ বলছে, .. .. আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। এতটা সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকার পরও, দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কমান্ডো স্টাইলে আবু বকর অপহরণের মতো ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, ওই চাঞ্চল্যকর অপহরণের মাত্র আট ঘণ্টার মাথায় সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলায় ফের অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ৮০ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে ব্যবসায়ীসহ ২ জন অপহূত হয়। এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। দিন দিন ওই অপহরণ বাণিজ্য বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে ১৬ কোটি লোকের মনে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতার বোধ। কিন্তু সরকার সাক্ষী গোপাল।
আবু বকরের ঘটনায় আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সাধারণত চাঁদা বা কোনো অনৈতিক দাবি আদায়ে ‘অপহরণ’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়। কিন্তু রিজওয়ানার দাবি, এক্ষেত্রে সেটা হয়নি। তাঁর পরিবেশবাদী আইনি কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা তাঁকে কোণঠাসা করতে এ ঘটনা ঘটায়। ঘটনার রহস্য এখনো উন্মোচন হয়নি। তবে রিজওয়ানার আশংকাই যদি সত্যি হয়, তবে সেটা হবে আরেকটি অশনি সংকেত। তাতে জনস্বার্থ মামলা বা এ-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বা সামাজিক আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা নিঃস্বার্থভাবে জনস্বার্থে কাজ করছে, তাঁরা মানসিকভাবে দমে যাবে। তাদের আত্মপ্রত্যয়ে ফাটল ধরবে। এই পরিণতির বিষয়টি মাথায় রেখে আশা করি সরকার আবু বকরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানে উদ্যেগী হবে। সঙ্গে জনশান্তি, জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিধানে অপহরণের মিছিল থামাতে কঠোর হবে।
ঢাকা
