সেদিন বেশি দূরে নয়

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৭
গত ক’দিন থেকে পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলে প্রধান খবরগুলোর একটি ছিল সেন্টমার্টিনে সাগরে গোসল করতে নেমে ৬ ছাত্রের সলিল সমাধি। চারজনের মৃতদেহ উদ্ধার। দু’জন এখনো নিখোঁজ। প্রতিবছরই এই খবরটি শিরোনাম হয়। যেমন হয় লঞ্চডুবি অথবা সড়ক দুর্ঘটনায় বিশাল সংখ্যক মৃত্যুর খবর। এটি যেন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। স্বজন হারানোর কষ্ট কত যে বেদনাদায়ক তা ভুক্তভোগী মাত্রই বুঝতে পারবে। বারবার একই দুর্ঘটনা ঘটার পরও এর প্রতিকার নেই কেন? ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সেন্টমার্টিন দ্বীপের বয়স প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর। আজ থেকে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে একটি মাত্র প্রবাল থেকে শুরু হয়ে আজকে এটি পৃথিবীর সর্ববৃহত্ প্রবাল দ্বীপে পরিণত হয়েছে। এই প্রবাল দ্বীপের শাখা-প্রশাখা মিয়ানমার, টেকনাফ, হিমছড়ি হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা কক্সবাজার, হিমছড়ি কিংবা টেকনাফের কচ্ছপিয়া উপকূলে যে সব কোরাল বা প্রবালগুচ্ছ দেখতে পাই তার সবগুলোর উত্পত্তিই এই সেন্টমার্টিন থেকে। সেন্টমার্টিন হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র প্রবাল দ্বীপ যেখানে বিরল প্রজাতির ‘সাদা কচ্ছপ’ অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার সাগর পাড়ি দিয়ে আসে ডিম পাড়তে, বংশ বিস্তার করতে। সেন্টমার্টিনের তীর ঘেঁষে পানির তলদেশে রয়েছে বিশেষ প্রজাতির ‘হর্স ফিস’র আবাসস্থল। হর্স ফিস হচ্ছে এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ যা দেখতে অবিকল লিলিপুট সাইজের ঘোড়ার মতো। দ্বীপে গবেষণারত সংগঠনের মতে, সেন্টমার্টিন দ্বীপের সাগর তলে এ যাবত্ প্রায় ১৫০ প্রজাতির কোরাল বা প্রবাল আবিষকৃত হয়েছে। চারিদিক থেকে নোনাজল পরিবেষ্টিত হওয়ায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে খাওয়ার পানির প্রচুর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে জমা হয়। এরপর এই বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে ফিল্টারাইজেশন হয়ে মাটির নিচে ৬-৮ ফুট স্তরে জমা হয়। যা স্থানীয় বাসিন্দারা সারা বছর ধরে খাওয়ার পানি হিসেবে ব্যবহার করেন। বিগত বেশ ক’বছর থেকে প্রচুর সংখ্যক পর্যটক সেন্টমার্টিন ঘুরতে যাচ্ছেন যাদের মধ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক রাত্রি যাপন করছেন। ফলে বিগত বছরগুলোয় মার্চ-এপ্রিলের পর খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে ফিল্টার হয়ে জমা পানি ফুরিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ টিউবওয়েলে পানি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। আর এখন তো জানুয়ারির পরই টিউবওয়েল পানি পাওয়া যায় না। মিনারেল ওয়াটার বা ডাবের পানিই একমাত্র ভরসা। প্রবালগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে কোনো প্রকার আঠালো বন্ডিং ছাড়াই টিকে আছে। ফলে জোয়ার-ভাটার সময় দ্বীপের অভ্যন্তরের কুয়ার পানি ওঠা-নামা করে। তার মানে হলো, দ্বীপের উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম বরাবর পানির প্রবাহ বিদ্যমান। তাহলে কীভাবে লাখ-লাখ বছর ধরে এই দ্বীপটি টিকে আছে? আইনগতভাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপে ইট ও কংক্রিটের ঘর-বাড়ি নির্মাণ এবং রাত্রিযাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনে দিনে ইট ও কংক্রিটের তৈরি ঘর-বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। খোদ প্রশাসনই আইনটি মানছে না তাহলে জনগণ মানবে কেন? আমার জানা মতে ‘ইকো রিসোর্ট লি.’ই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইট ও কংক্রিট বাদ দিয়ে কাঠের ঘর-বাড়ি নির্মাণ করেছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপটি বসবাসের জায়গা নয়; এটি বরং গবেষণার স্থান। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে যাচ্ছেতাইভাবে সেন্টমার্টিনকে ব্যবহার করা হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে সেদিন বেশি দূরে নয় যখন পুরো দ্বীপটিই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। আমার মনে আছে ২০০০ সালের জানুয়ারির দিকে দ্বিতীয় দফায় ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। ট্রলার থেকে নেমে বাজারে ঢুকতেই হোটেলের কর্মচারীরা হাত ধরে টেনে তাদের রেস্টুরেন্টে ঢোকাতে চাইলো। বাইরে থেকে আসা পর্যটকগণ বিষয়টাতে বিরক্ত হলো। রেস্টুরেন্টের সামনে রান্না করা খাবার খোলা রেখে দিয়েছে। ওপরে মাছি ভনভন করছে। উপায় নেই দেখে সেগুলোই খেতে হলো। আর অবধারিতভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো পেটব্যথা, সঙ্গে পাতলা পায়খানা। সে রাতেই বন্ধুরা মিলে হোটেল মালিকদের নিয়ে আলোচনায় বসলাম। তাঁদেরকে বোঝালাম এভাবে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলে কেউই রেস্টুরেন্টে ঢুকবে না। ডাকতে হবে যার যার রেস্টুরেন্টের দরজায় দাঁড়িয়ে। আর রান্না করা খাবার রাখতে হবে ভেতরে কাচের শেলফে। তাজা মাছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে সামনে সাজিয়ে রাখতে হবে যাতে ক্রেতারা পছন্দের মাছ বাছাই করে রান্নার জন্য অর্ডার দিতে পারেন। ময়লা ফেলতে হবে নির্দিষ্ট জায়গায়। আমরা প্লাস্টিকের ড্রাম কিনে কয়েকটা ডাস্টবিন বানিয়ে দিলাম। পরদিন থেকেই হোটেল মালিকরা আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলো এবং হাতেনাতে ফলও পেলো। এরপর অসংখ্যবার সেন্টমার্টিন যেতে হয়েছে। অনেক রেস্টুরেন্টে মালিকানা বদল হয়েছে কিন্তু দেখে ভালো লেগেছে যে অধিকাংশ রেস্টুরেন্টই এখনো নিয়মগুলো মেনে চলতে চেষ্টা করছে। এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই আর তা হলো সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে মানুষকে মোটিভেট করতে পারলে চিহ্নিত সামাজিক সমস্যাগুলো নির্মূল করা সম্ভব। সমুদ্রে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে মরা আমাদের সমাজে নিয়মিত দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ নিয়ম হলো, ভাটার সময় সমুদ্রে গোসল করতে নামা নিষেধ। এটা সবাই জানেন। তারপরও অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে আর অকালে ঝরে পড়ছে অনেক মেধাবী ছাত্র। সেন্টমার্টিনে নির্দিষ্ট স্থান আছে যেখানে গোসল করা খুবই সহজ এবং আনন্দদায়ক। যেমন সেন্টমার্টিনের পশ্চিম দিকে গলাচিপা এলাকার ‘রেইন বো বিচ’ (আমাদের দেওয়া নাম)। সমুদ্রে গোসল করার জন্য নিরাপদ সময় কখন ও স্থানটি কোথায় তা জানা থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। ইউনিয়ন পরিষদ, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও বিডিআরসহ সেন্টমার্টিনে কর্মরত সকল সামাজিক সংগঠনকে একত্রিত করে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর তা করতে হবে এখনই। সকল হোটেল, মোটেল মালিকদের বাধ্য করতে হবে সমুদ্রে নেমে গোসল করার নিয়মাবলি সংবলিত ব্যানার তাদের কাউন্টারে প্রদর্শন করার জন্য এবং সেটা মেনে চলার জন্য পর্যটকদের উদ্বুদ্ধ করতে। এছাড়া যখনই কোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্ররা দল বেঁধে সেন্টমার্টিন, টেকনাফ কিংবা কক্সবাজার বেড়াতে যাবে, তাদেরকে সমুদ্রে নেমে গোসল করার নিয়মাবলি সম্পর্কে আগাম সতর্ক করে দিতে হবে। আর তবেই কেবল আমরা এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পারবো। ঢাকা