সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫৩
দেশে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে ভাটা চলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ তেমন বাড়ছে না। ছোট-খাটো উদ্যোক্তারা এখন ব্যবসায় বিনিয়োগের চাইতে অর্থ জমিয়ে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। যে কারণে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। শুধু চলতি অর্থবছরের (২০১৩-১৪) ফেব্রুয়ারি মাসে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২৬২ কোটি ১৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। এ খাতে বিপুল বিনিয়োগে সরকার খুশি। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ না নিয়ে সরকার এখন সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিচ্ছে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ছয় হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। যা বাজেটে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় সোয়া হাজার কোটি টাকা বেশি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিচ্ছে কম। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সাধারণত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সরকার ব্যাংক থেকে মাত্র তিন হাজার ৮০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর আগের অর্থবছরে (২০১২-১৩) একই সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে মোট আট হাজার ১৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলো। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় এবার ব্যাংক থেকে সরকারকে খুব বেশি ঋণ নিতে হবে না। এর আগের অর্থবছরে (২০১২-১৩) ব্যাংক থেকে সরকার ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করে। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার ঋণ নিয়েছে সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ কম নেয়ায় ব্যাংকে প্রচুর পরিমাণ অলস অর্থ পড়ে আছে। এর পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। গত অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের সমালোচনা করে। কারণ এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়েছিলো। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এদিকে সাধারণ আমানতকারীরা এখন ব্যাংকে অর্থ রাখার চাইতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ব্যাংক আমানতের চাইতে সুদের হার বেশি হওয়ায় সঞ্চয়পত্রের দিকে এখন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ ব্যাংকের আমানতের সুদের হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। এক সময় পারিবারিক সঞ্চয়পত্র আমানতকারীদের কাছে লোভনীয় হলেও এখন প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র, পাঁচ এবং তিন বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, ছয় ও তিন মাস অন্তর মুনাফা সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে বেশি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি আগের পুরো অর্থবছর থেকে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিলো ৭৭২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আর এবার শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২৬২ কোটি ১৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। তবে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়ে যাওয়ার পেছনে শুধু সুদের হার বেশি হওয়াই নিয়ামক নয়, আমানতকারীদের অর্থ বিনিয়োগে না যাওয়াও এর অন্যতম কারণ। অর্থনীতির বিশ্লেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিনিয়োগের খুব বেশি জায়গা না থাকায় সাধারণ জনগণ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। কারণ তারা সবসময় তাদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা চায়। এক সময় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলেও এখন সেখান ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় তারা সেদিকে যাচ্ছে না। অন্যান্য বিনিয়োগেও মুনাফা হবে বলে মনে করছেন না তারা।