‘মা যখন আইতো অনেক মিঠাই নিয়া আইতো। আমারে কইতো, বাবা মিঠাই খাও। আমি মারে খাইতে কইলেও মা খাইতো না। কইতো, তুমি খাও বাজান, তুমি খাও। না, এখন আর কেউ মিঠাই আনি দেয় না...! মায়ে গেঞ্জিও আইন্যা দিত’— মায়ের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে ছোট্ট বিজয়ের চোখ ভিজে যায়। শূন্যে দৃষ্টি মেলে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করে বিজয়। বলে, ‘বড় হইয়্যা ডাক্তার হমু। মাইনষ্যের অসুক হইলে ঔষধ দিমু।’ রানা প্লাজায় নিহত সেলিনা আক্তার ও শাহাদত হোসেনের একমাত্র সন্তান শুভ ইসলাম বিজয় (৮) এভাবেই তার স্বপ্নের কথা জানালো।
রানা প্ল¬াজা ধসে বাবা-মা হারানো এ শিশুটির কথা আসলে নিহত শ্রমিকদের ২৮৫ শিশুরই কথা। আনন্দপুর সংকলন পাঠশালায় প্রথম শ্রেণীর ছাত্র বিজয়। শিশুটির বয়স আট বছর জানালেও দেখতে তাকে ৫/৬ বছরের বেশি মনে হয় না। বিজয় এখন থাকে নানী রাজিয়া খাতুনের কাছে। সেই সংসারেও চরম অভাব-অনটন।
রাজিয়া খাতুনের আরেক মেয়ে পারভীন, সেও রানা প্লাজা ধসে নিহত হয়েছে। সেই পারভীনের চার বছরের ছেলে পারভেজ। পারভেজকে তার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলে, আধো ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাষায় জানায়— ‘মা নাই, মা আর আইবো না। মা অনেক দূরে গ্যাছে।’ ছোট্ট পারভেজের নানী বলেন, ‘মায়ের অপেক্ষোয় থাকতে থাকতে বাইচ্যা এখন আর মাকে খোঁজেই না। এখন হ্যায় বুইজ্যা গেছে তার মায়ে আর আইব না।’
পারভেজ মায়ের গুরুত্ব কী বুঝলই না। তার আগেই যে মা চলে গেছে না ফেরার দেশে। শ্যামলা বর্ণের ছোট্ট পারভেজের মুখটাতে যেন রাজ্যের মায়ামাখা। ডাগর দুইটি চোখের চাহনী খুব সহজেই মনকাড়ে। এই শিশুদুইটির খাবারের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন রাজিয়া খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাইচ্যা দুইটা সারাদিন খেলে, খানিক বাদে বাদে খাবার দেওন লাগে, হেই খাবার পামু কই। সহায়তা বলতে বিকাশের মাধ্যমে দুই বার টাকা পাইছি।’
মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গা থানার খাসির চর এলাকার বাসিন্দা রাজিয়া খাতুনের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। চার মেয়ের মধ্যে তিন জনের আয়ে চলতো সংসার। দুই মেয়েকে হারিয়ে তাদের দুই অবুঝ শিশুকে নিয়ে রাজিয়া খাতুন যেন অথৈ সাগরে পড়েছেন।
তিনি বলেন, তিন বছরের পারভেজকে রেখে রানা প্লাজা ধসে মারা যায় পারভীন। সেই সময় মায়ের জন্য শিশুটির যে ব্যাকুলতা ছিল, সে কথা বলতে বলতে নানী রাজিয়া খাতুন কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘আমার চাইড্যা মাইয়্যা; ছেলে নাই। তিন মাইয়্যা গার্মেন্টসে কাজ করতো। দুই মাইয়্যা মইর্যা গেছে, এক মাইয়্যা বাইচ্যা আসচে। হ্যায়ও এখন বাড়িত বসা।’
বিজিএমইএ আহত শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়ার কথা বললেও এই শিশুদুইটি কোন সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি বলে জানান রাজিয়া খাতুন। শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, এসব শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে নেয়ার কথা থাকলেও সে প্রতিশ্রুতি তারা রাখেনি।
বিজিএমইএ-এর অতিরিক্ত সচিব জগলুল হায়দার বলেন, আমাদের এখানে দুইটি উন্নত মানের এতিমখানা আছে। সেখানে রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিকদের ৩০ সন্তানকে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই দুইটি এতিমখানায় আমরা ৩০০ শিশুকে রাখতে পারবো। আমরা খোঁজ করছি, যে কোন মাধ্যম থেকে খোঁজ পেলে তাদের আমরা দায়িত্ব নিবো।
