চার্জশিট প্রস্তুত প্রধান আসামি সোহেল রানা

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৩৮
ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানাকে এক নম্বর আসামি করে সাভারের রানা প্লাজার ভয়াবহ ধসের ঘটনায় দায়ের করা তিন মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এই তিন মামলায় সোহেল রানাসহ ২১ জন গ্রেফতার রয়েছেন। প্রধান আসামি সোহেল রানা বর্তমানে কাশিমপুর ‘হাই সিকিউরিটি’ কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তবে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ৯ জন আদালতের নির্দেশে জামিনে রয়েছেন। জামিনপ্রাপ্তরা হলেন, রানার বাবা আবদুল খালেক, রানার আশ্রয়দাতা অনিল, শাহ আলম, হাসান, সাভার পৌরসভার মেয়র রেফায়েত উল্লাহ, প্রকৌশলী এমতেমাম হোসেন, আলম মিয়া, রফিকুল ইসলাম ও পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার মোহাম্মদ আলী। এছাড়া রাজউকের ইমারত আইনে দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও আপিল বিভাগ তা বাতিল করে দিয়েছে। গত বছরের ২৪ এপ্রিল ওই ভবন ধসের পর সাভার থানায় এসআই ওয়ালী আশরাফ খান বাদি হয়ে দন্ডবিধি ৩০৪ (ক) (অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু) ধারায়, রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল আহম্মেদ বাদি হয়ে ইমারত আইনে এবং সরাসরি হত্যার অভিযোগ এনে নিহত শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলী আক্তার পৃথক তিনটি মামলা করেন। তিনটি মামলাই তদন্ত করছেন সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর। তিনি জানান, তিনটি মামলার মধ্যে সরাসরি হত্যা মামলা বাদে বাকি দুইটি মামলার চার্জশিট প্রায় চূড়ান্ত। রাজউকের ইমারত আইনে দায়ের করা মামলায় আসামি থাকবে ১৭ জন। পুলিশের দায়ের করা মামলায় আসামি থাকছে ৪০ জন। এই ৪০ জনের মধ্যে ইমারত আইনে দায়ের করা মামলার ১৭ জনও রয়েছেন। আগামী মে মাসের মধ্যে এই দুই মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। অন্যদিকে হত্যা মামলার তদন্তও শেষ পর্যায়ে। চার্জশিটে সোহেল রানাসহ একই ব্যক্তিদের আসামি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় চার্জশিটে মূল অভিযুক্ত হিসেবে থাকছে ভবন মালিক সাভারের যুবলীগ নেতা সোহেল রানার নাম। এছাড়া মামলায় রানা প্লাজার পাঁচ পোশাক কারখানা নিউ ওয়েভ বটমস, নিউ ওয়েভ স্টাইল, ফ্যান্টম টেক্স, ফ্যান্টম অ্যাপারেল ও ইথার টেক্স লিমিটেডের মালিক ও কর্মকর্তাসহ ১৮ জনকে আসামি করা হচ্ছে। চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ভবনে অবৈধভাবে কারখানা স্থাপন, কারখানা অনুমোদনের জন্য ভবনের ভুয়া নকশা দাখিল, অবৈধভাবে লাইসেন্স সংগ্রহ, বিধিবহির্ভূতভাবে ভারী যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর বসানো এবং ফাটল দেখার পরও কারখানা সিলগালা না করার অভিযোগ আনা হচ্ছে। সূত্র জানায়, কারখানার মালিক ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হচ্ছে। তারা হলেন কর্মচারী বশির আহমেদ, নয়ন মিয়া, আবদুল হামিদ, আবদুল মজিদ, ইউসুফ আলী ও আমিনুল ইসলাম। তাদের বিরুদ্ধে ভবনে ফাটল দেখার পরও ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের কাজে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চার্জশিটে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক, রানার আশ্রয়দাতা আবুল হাসান, রানাকে পালানোয় সহযোগিতা করা শাহ আলম মিঠু, অনিল কুমার ও হাসানের নামও থাকছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, চার্জশিটে সরকারের চারটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা হলেন, সাভার পৌরসভার মেয়র রেফায়েত উল্লাহ, ওয়ার্ড কমিশনার মোহাম্মদ আলী, পৌরসভার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তর কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী রকিবুল হাসান, সাভারের গণপূর্ত প্রকৌশলী এমতেমাম হোসেন ও সারোয়ার, সহকারী প্রকৌশলী আলম মিয়া ও পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইয়াসমিন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ-অবৈধভাবে ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণ ক্ষেত্রে তদারকি না করা এবং ফাটল জানার পরও সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া। স্মরণকালের ভয়াবহ এই ভবন ধসের ঘটনায় সরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদফতর, সাভার পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত এবং সময়মতো নজরদারি না করার অভিযোগ আনা হচ্ছে রাজউকের প্রধান ইমারত পরিদর্শক রাহেলা খাতুন ও ইমারত পরিদর্শক আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। ভুয়া নকশার ওপর ভিত্তি করে কারখানার অনুমোদন দেয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে শিল্প-সম্পর্ক শিক্ষায়তনের প্রকল্প পরিচালক বেলায়েত হোসেনসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টসূত্র জানায়, ধসের আগের দিন রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দেয়ার পর স্থানীয় প্রশাসক হিসাবে সাভারের ইউএনও কবির উদ্দিন সরকার ভবনটি সিলগালা না করে চালু রাখার বিষয়ে মালিকপক্ষকে উত্সাহ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে চার্জশিটে তার নাম রাখা হচ্ছে না। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে ভবন নির্মাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের অভিযোগে প্রকৌশলী সারোয়ার কামাল, কর্মচারী আতাউর রহমান, আবদুস সালাম, বিদ্যুত্ মিয়া, রেজাউল ইসলাম ও ঠিকাদার নান্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, তিন মামলায় ৬ শতাধিক পোশাক শ্রমিকসহ দেড় হাজারেরও বেশি লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, উদ্ধার কর্মী, আহত শ্রমিক, নিহতদের স্বজন ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যসহ অন্তত পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে সাক্ষী করা হয়েছে। এ ঘটনার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে এক হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার কেস ডায়েরী (সিডি) তৈরি করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সোহেল রানার ১৭৫ শতক জমি বাজেয়াপ্ত করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। বাজেয়াপ্ত করা জমির মধ্যে সাভারের রানা প্লাজার ১৮ শতক জমি, রানা কমপ্লেক্সের ১০ শতক এবং ধামরাই থানাধীন আরো ১৪৭ শতক জমি রয়েছে। ২৪ এপ্রিল ‘শ্রমিক নিরাপত্তা ও শোক দিবস’ ঘোষণার দাবি ভবন ধসের ঘটনায় দোষীদের শাস্তি আর সকল ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানিয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি নেতৃবৃন্দ। একইসঙ্গে তারা ২৪ এপ্রিলকে ‘শ্রমিক নিরাপত্তা ও শোক দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করারও দাবি জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে তারা এ দাবি জানান। এ সময় তারা রানা প্লাজা ধসের বছরপূর্তি উপলক্ষে দুইদিনের কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এর মধ্যে আজ সকালে কাফনের কাপড় পরে সাভার রানা প্লাজার সামনে প্রতিবাদ মিছিল ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এবং আগামীকাল বিকাল ৪টায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে সংহতি সমাবেশ ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিলম্ব সহ্য করা হবে না:সিপিবি এদিকে রানা প্লাজা ‘হত্যাকাণ্ড’র বছরপূর্তিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’র (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে নিহত শ্রমিকদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে অবিলম্বে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সাভারের রানা প্লাজার ঘটনা ছিল শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে পরিচালিত এক ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ। কিন্তু বছর অতিক্রান্ত হলেও, এখন পর্যন্ত এ ঘটনার বিচার হয়নি। অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়নি। তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরাও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি। তারা বলেন, ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের উদাসীনতার ব্যাপারে সরকারও নীরব। কিন্তু মালিকপক্ষের উদাসীনতা আর সরকারের নীরবতা আর মেনে নেয়া হবে না। ক্ষতিপূরণ প্রদানে আর বিলম্ব সহ্য করা হবে না। ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন :এইচআরডব্লিউ সাভারে রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গতকাল বুধবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার পরিচালনায় ৪ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র দেড় কোটি ডলার পেয়েছে তারা। তবে গত ২২ এপ্রিল সরকার ঘোষণা করেছে এই তহবিল থেকে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম ধাপে ৬৪৫ ডলার করে পাবে। বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ’র এশীয় অঞ্চলের ডেপুটি পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, রানা প্লাজা ট্রাজেডির এক বছর পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবার চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত আহতদের এবং নিহত পোশাক শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করা। বিবৃতিতে বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।