ঢাকায় ৫৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা;
তিন-চার দিনের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, তাপমাত্রা আরো বাড়তে পারে;
পানির তীব্র সংকট;
প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৬০ সালের পর অর্থাত্ গত ৫৪ বছরের মধ্যে এটি ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এছাড়া গতকাল যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে জ্বর, ডায়রিয়াসহ নানা অসুখে।
এ অবস্থায় কোন সুখবর দিতে পারেনি আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে সূর্যের তাপ। এছাড়া আকাশে কোনো মেঘের বলয় নেই। এতে সূর্যের তাপ কোনো বাধা না পেয়ে সরাসরি চলে আসছে ভূ-পৃষ্ঠে। যে কারণে গরমের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। এই গরম আরো কয়েকদিন থাকবে।
এদিকে তীব্র দাবদাহের কারণে পানির স্তর অনেক নীচে নেমে যাওয়ায় রাজধানীতে কোন কোন এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিপাকে পড়েছে কৃষক।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্তব্যরত আবহাওয়া পূর্বাভাস কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার এ সময়ে তাপমাত্রা বেশি। গতকাল যশোর ও ঢাকা ছাড়াও খুলনা এবং রাজশাহীতেও তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও খুলনায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। তিনি বলেন, এর আগে ১৯৬০ সালে ঢাকায় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস ও ১৯৮৫ সালে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
আবহাওয়া অধিদফতরসূত্র জানায়, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু ধরনের তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ ও ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ হবে। এই হিসাবে দেশ বর্তমানে তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতি বছর এপ্রিলের এই সময়ে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টি হচ্ছে না। আমাদের কাছে আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস আছে, তাতে আগামী তিন-চারদিনের মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।’
তিনি বলেন, এপ্রিল মাসে সাধারণত দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয় ১৪৭ মিলিমিটার। কিন্তু গত ২০ দিনে সারা দেশে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ৬২ মিলিমিটার। ফলে বৃষ্টি না হওয়ায় এত গরম।
এদিকে তীব্র তাপদাহে পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় চাহিদামতো পানি সরবরাহ করতে পারছে না ওয়াসা। ফলে রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল রাজধানীর শ্যামলী, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা পানির সংকটের এ অভিযোগ জানান।
এ প্রসঙ্গে ওয়াসার সহকারী জনতথ্য কর্মকর্তা আব্দুল কাদের গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে রাজধানীতে পানির চাহিদা ২৩০ কোটি লিটার। ওয়াসা চাহিদার সমপরিমাণ পানি সরবরাহ করে থাকে। তবে এখন খরার কারণে পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় কোন কোন এলাকায় চাহিদামতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বৃষ্টি হলে এ সমস্যা থাকবে না।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, গতকাল জীবননগরে ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে। গত এক সপ্তাহ থেকে জীবননগরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দাবদাহ ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। উপজেলায় ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি কাবু হয়ে পড়েছে। গরমের কারণে রোদ বাড়ার সাথে সাথে উপজেলার রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, একটানা অনাবৃষ্টিতে গোয়ালন্দের কৃষকরা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে জমিতে ঘন ঘন সেচ দেয়ার ফলে ফসলের উত্পাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির অপেক্ষায় থেকে থেকে চলে যাচ্ছে পাট বপনের মৌসুম।
বর্তমানে তীব্র খরায় খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচযন্ত্রও বিকল হচ্ছে ঘন ঘন। এমন পরিস্থিতিতে লোকসানের আশঙ্কায় পেয়ে বসেছে সাধারণ চাষিদের।
উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চর বালিয়াকান্দি গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ শেখ বলেন, টানা অনাবৃষ্টির কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। আগের তুলনায় সেচযন্ত্র দিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, গোদাগাড়ীতে দাবদাহে ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার বরেন্দ্র ও চর অঞ্চলের হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। গতকাল গোদাগাড়ীতে তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা নেই। কৃষি শ্রমিকসহ দিনমজুর মানুষ মাঠে প্রচণ্ড তাপ ও রৌদ্রে কাজ করতে পারছে না। কর্মহীন হয়ে পড়ায় তারা অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এদিকে প্রতিদিন লোডশেডিংয়ের কারণে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র শিল্পসহ অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ-কর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
