মানুষ নানা কাজে প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। আর এই যন্ত্রগুলো তৈরিতে নানা ধরনের গবেষণা করে আসছে বছরের পর বছর। এ গবেষণার ফল আসা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে মঙ্গলে পাঠানো সম্ভব হয়েছে রোবোট। এসব রোবটদের নিয়ে আজকের আয়োজনটি লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
রোবটদের ইতিহাসের শুরু কিন্তু অনেক অনেক দিন আগে। তখনও যিশুখ্রিস্টের জন্ম হয়নি, আমরা যে ইংরেজি সন মেনে চলি, তখনও সেই সন গণনাও শুরু হয়নি। আর রোবটদের ইতিহাসের শুরু যিশুর জন্মেরও ৩২০ বছর আগে। অ্যারিস্টটল, পৃথিবীর সেরা দার্শনিকদের একজন ছিলেন। তিনি সেই আদ্যিকালেই বললেন যে, যদি সব যন্ত্র আদেশ দিলেই কাজ করত, কিংবা নিজে নিজেই তা করতে পারত যা ওই যন্ত্রের করার কথা! তাহলে আর কাউকে শিক্ষানবীশ হতে হতো না, কাউকে দাসও থাকতে হতো না। যে যন্ত্র নিজে নিজেই কাজ করতে পারে, তার এই কল্পনার বাস্তব রূপ হলো রোবট। অ্যারিস্টটলের এই ধারণার প্রায় দেড় হাজার বছর পরেও রোবট নিয়ে আর কোনো কাজই হয়নি। হবে কীভাবে, চিন্তা করলেই তো আর রোবট তৈরি হয় না। সেজন্য যেমন প্রতিভাবান মানুষ লাগবে, তেমনি লাগবে উপযুক্ত প্রযুক্তি। তবে ১৪৯৫ সালে কিন্তু একজন উপযুক্তু প্রযুক্তি ছাড়াই প্রথম রোবট বানানোর পরিকল্পনা করলেন। তার নাম লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তিনিই প্রথম রোবট তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯১৩ সাল। পৃথিবীতে প্রথম কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকে কাজে লাগানো হলো। কাজে লাগালেন হেনরি ফোর্ড, তার গাড়ির কারখানায়। তৈরি হলো কনভেয়ার বেল্ট। তিনিই প্রথম এই স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ার বেল্ট ব্যবহার করেন। তবে প্রশ্ন জাগতে পারে এটা কীভাবে রোবট হয়!! তার উত্তর হলো, যেই যন্ত্র নিজে নিজে কাজ করতে পারে, সেটাই রোবট। অবশ্য, তখনও পর্যন্ত মানুষ এগুলোকে রোবট বলত না। বলা শুরু করল ১৯২০ সাল থেকে। আর নামটির প্রচলন করেন ক্যারেল কাপেক। তিনি একটি মঞ্চনাটক তৈরি করেন, নাম ‘রসিউম’স ইউনিভার্সাল রোবটস’। সে এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে মানুষ অনেক উন্নতমানের রোবট তৈরি করেছিল। কিন্তু পরে তাদের তৈরি এই রোবটগুলোই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। রোবটেরা সব ক্ষমতা দখল করে মানুষদেরই দাস বানালো! গল্পটা পড়ে পরিচিত মনে হতে পারে, কারণ এই কাহিনী নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘দ্য টার্মিনেটর’, ‘ম্যাট্রিক্স’-এর মতো সিনেমাগুলো।
এর ১২ বছর পর, ১৯৩২ সালে জাপান তৈরি করল এক সত্যিকারের রোবট। অবশ্য আকৃতিতে এতই ছোট ছিল যে, একে খেলনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না; মাত্র ১৫ সে.মি.। আর তাই এর নামও দেওয়া হলো ‘লিলিপুট’। এই রোবট পারত শুধু হাঁটতে। ১৯৫৪ সালে জর্জ ডেভল আর জো অ্যাঙ্গেলবার্গ তৈরি করলেন পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামেবল রোবট। এর নাম দিলেন তারা ‘আর্ম’। আর এই ‘আর্ম’-ই প্রথম জেনারেল মটর্সের কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে মানুষকে সরিয়ে সেই জায়গায় কাজ করতে শুরু করল। ১৯৫৭ সালে রাশিয়া মহাকাশে পাঠালো প্রথম স্যাটেলাইট ‘স্পুটনিক’। ১৯৬৪ সালে আইবিএম তৈরি করল প্রথম বলার মতো কম্পিউটার আইবিএম ৩৬০। ১৯৬৯ সালে রোবটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তো নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিনরা চাঁদ থেকেই ঘুরে এলেন। ১৯৯৪ সালে কার্নেগি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করল ৮ পায়ের এক রোবট। নাম দান্তে টু। শুধু তাই না, এটা ব্যবহার করে সংগ্রহ করা হলো আগ্নেয়গিরির ভেতরের গ্যাসের নমুনাও! ১৯৯৭ সালে রোবটের ইতিহাসে ঘটল এক বিরাট ঘটনা। আইবিএম ‘ডিপ ব্লু’ নামে এক কম্পিউটারের মাথার ভেতর দাবা খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করে ঢুকিয়ে দিল। আর তারপর সে খেলতে বসল তখনকার সেরা দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভের সঙ্গে। আর ঠিকই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দিল তখনকার সেরা এই দাবাড়ুকে। একই বছর জাপানে শুরু হলো রোবোকাপ টুর্নামেন্ট। আর তাদের এই কাজের পেছনের উদ্দেশ্য হলো, ২০৫০ সালে রোবটদের এমন এক ফুটবল দল বানানো, যেটা পৃথিবীর সেরা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলকেও হারিয়ে দেবে! এদিকে এতদিন বিখ্যাত ইলেক্ট্রোনিক কোম্পানি সনি মাঠের বাইরেই ছিল। এবার তারাও মাঠে নামলো। ১৯৯৯ সালে ওরা তৈরি করল ‘আইবো’ নামের এক কুকুর। এই রোবট কুকুর মালিকের সঙ্গে সাধারণ কুকুরের মতো আচরণ করতে পারে, শিখতে পারে, এমনকি মালিকের বিনোদনের দায়িত্বও এই কুকুরের! মানুষও চায় রোবটকে দিয়ে কাজ করাতে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল ২০০৮ সালে। ২০০২ সালে বাজারে ছাড়া হয়েছিল রুম্বা নামের এক ভ্যাকুয়াম ক্লিনার রোবট। মাত্র ৬ বছরেই এই ক্লিনার রোবট বিক্রি হয়েছে আড়াই মিলিয়নেরও বেশি। ২০০৫ সালে কর্নেলি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন আরেক আশ্চর্য রোবট। রোবটটি অনেকগুলো ছোট ছোট কিউব দিয়ে তৈরি। চুম্বকের মাধ্যমে এগুলো একসঙ্গে মিলে থাকে। এই রোবটের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এটা নানা আকৃতি নিতে পারে।
