যুক্তির জাদুকর

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ১৮:৩৬
বন্ধুরা যখন হৈ-হুল্লোড় করে বেড়াতেন, মেয়েটা তখন আপন মনে ভেবে চলেছেন অন্য কিছু। বয়স কত তখন, আট কি নয়। বাবা বলতেন মেয়েটা হয়তো দার্শনিক হয়ে যাবে, সবকিছুই যার ভাবনাচিন্তাতেই সমাধান হয়ে যাবে। বাবার ধারণা সঠিক হয়নি। স্কুলে ভর্তি হয়েই বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন, প্রথার বাইরে বেরিয়ে নানা ভাবনায় ভাবতে শিখলেন তিনি, সেগুলোর পেছনে দাঁড়াত যুক্তি। আর যুক্তির এই সৌন্দর্যে প্রীত হয়েই বনে যান যুক্তির জাদুকর আইনের ভক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী, এই পরিচয় দেওয়ার আগেই তার ঝুলিতে অসংখ্য অর্জন। স্কুলের বিতর্ক দলের দলনেতা, ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ডিবেটিং ক্লাবের সহ-সভাপতি তিনি। এখন কাজ করছেন মানবাধিকার নিয়ে। বহুগুণের এই সুস্মিতা চৌধুরী তাই আমাদের আজকের অন্য তারুণ্যে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র প্রকৃতির হাতে গড়া জাদুঘর চট্টগ্রামে কেটেছে তার শৈশব। বাবা শুভাগত চৌধুরী একজন বিজ্ঞান লেখক, সেই সাথে বারডেমের ল্যাব পরিচালক। আর মা একজন গৃহিণী। সুস্মিতা তাই ছেলেবেলা থেকেই পেয়েছেন অনেক বড় একটা পরিসরে বেড়ে ওঠার সুযোগ। তার চুপচাপ স্বভাব নিয়ে তখন সবাই মজা করত, উচ্ছলতায় ভরা শৈশবের দিনগুলো কেটেছে তার ম্রিয়মান, সেই নীরবতাকেই বলা যায় তার চিন্তার মুক্তি। নিজের মতো ভাবতে শিখেছেন, দুনিয়াটাকে দেখতে পেরেছেন নিজের কল্পনা থেকে। মাঝে মাঝে ছোটবেলায় সুস্মিতা সেই কল্পনার জগতটাকে রূপদান করে ফেলতেন রংতুলির সুচারু আঁচড়ে। এই ছবি আঁকাতেই তার প্রথম পুরস্কার ঘরে আসে। এরপর চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই বিতর্কের সাথে পরিচয় ঘটে তার। কিডস ডিবেটিং ক্লাব ও নাটুয়া ডিবেটিং সোসাইটি থেকে তিনি প্রাথমিক প্রশিক্ষণও নেন। শুরু করেই বিদ্যালয়ের সবার নজরে আসেন তিনি। অষ্টম শ্রেণীতে উঠেই স্কুলের ডিবেটিং টিমের দলনেতার দায়িত্ব পান। আর খুদে সেই বিতার্কিকের দলকে বলা যায় ‘অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন’। তার সময়ে সবগুলো প্রতিযোগিতাতেই চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তার হাতে। এর চেয়ে আনন্দের বিষয় সুস্মিতার কাছে আর কী হতে পারে! জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার দল রানার্স-আপ হলেও সেরা বক্তার পুরস্কারটা সুস্মিতাকেই দিতে হয়েছিল বিচারকদের। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দর্শকশ্রোতারা তার কথা শুনেছে টানা চার মিনিট, যুক্তিখণ্ডনে এসেও বিপক্ষের বক্তারা যেন হিমশিম খেয়ে যায় তার যুক্তির বানে। বলাই বাহুল্য সুস্মিতার এই অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে দেশসেরা বারোয়ারি বিতার্কিকের পুরস্কারও। স্কুল ছেড়ে কলেজে আসেন তিনি, আর এমন বিতার্কিক বিতর্ক নিয়ে আবার জড়িয়ে পড়লেন। ভিকারুন্নিসা নূনের ডিবেটিং ক্লাবের সহ-সভাপতি হয়ে গেলেন তিনি। দেশের সেরা এই নারী শিক্ষালয়ের ২০০৫ সালের গার্ল অব দ্য ইয়ার তার অন্যতম প্রাপ্তি। তিনি মনে করেন ভিডিসি-তে কাজ করে তিনি সাংগঠনিক অনেক কিছু শিখতে পেরেছেন। প্রতিকূল পরিবেশে মাথা ঠাণ্ডা রেখে বিজয়ীর বেশে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষাটা ভিডিসি খুব ভালোই দিতে পারে তার সদস্যদের। আর এসব কাজের মধ্য দিয়েই সুস্মিতার ধারণা তৈরি হলো যে, নিজেকে প্রকাশের কাজটা তিনি বেশ ভালোই পারেন। সেই সাথে ছেলেবেলার আইন পেশায় আসার একটা ইচ্ছে, দুইয়ের মেলবন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ভর্তি হলেন তিনি। ঠিক করলেন যারা নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন না, তাদের কথাকেও তিনি তুলে ধরবেন মানুষের সামনে। পেশাটা এখন তার কাছে যদিও বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে। এই যুক্তিশিল্পী সেই দ্বিতীয় বর্ষেই কাজ শুরু করেছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানে ড. মিজানুর রহমানের সংগঠন ইএলসিওপি-এর সাথে। তার সাথে কাজ করাটা অনেক ভাগ্যের ব্যাপার। মানুষটার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছেন তিনি। সুস্মিতা মনে করেন প্রতিটা মানুষই সম্ভাবনাময়। প্রত্যেকের মাঝেই সৃজনশীলতা আছে। নিজেকে তাই বুঝতে চেষ্টা করতে হবে, যেটা করছি সেটা মন থেকে করতে হবে। আর সেই পথে নিজেকে ধরে রাখতে হবে। খুব সুন্দর করে সুস্মিতা কথাটা এভাবে বললেন, ‘যে কাজটা করছি, মনে করতে হবে এটাই পৃথিবীর কেন্দ্র। নিজেকে তখন আবিষ্কার করা যায়, সৃজনশীলতা প্রকাশ পায়।’ তিনি আরও মনে করেন, সবকিছু থেকেই শেখা যায়। যদি অনেক বেশি দেখা, শোনা, আর পড়া যায়, নিজেকেই নিজে ছাপিয়ে যাওয়া যায়। আর সবকিছুই করতে হবে নিজের জীবনচরিত ঠিক রেখে। সুস্মিতার আরও একটি পরিচয় আছে, নিজের গোছালো কথামালাকে বই আকারে বের করছেন তিনি। মানবাধিকার কমিশন থেকেই বইটি বের হবে। সবশেষে তিনি জোর গলায় বললেন, ‘তারুণ্যই পারে সবকিছু বদলে দিতে, সেই পরিবর্তনটা আসছে আমাদের মাঝে।’