আমাদের প্রিয় এই বাংলাদেশকে ঢের বদলে দেওয়া সম্ভব কেবলই রাজনৈতিক সুসমন্বয় এবং কর্মের মাধ্যমে, যেখানে বিতর্ক চর্চা বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিতর্ককে নিয়ে যেতে হবে একেবারে তৃণমূলে। নগর থেকে বিতর্ককে গ্রামাঞ্চলে নিয়ে যেতে হবে। বির্তক নিয়ে সংগঠকদের ভাবনার কথা উঠে এসেছে এবারের আয়োজন
‘দেশে সৃজনশীল বিতর্ক চর্চার
আরও প্রসার ঘটানো প্রয়োজন’
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ
চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
সারাদেশে সুন্দর, সৌন্দর্যময় সৃজনশীল বিতর্ক চর্চার প্রসার ঘটিয়ে এবং যুক্তিশীল আলোকিত তারুণ্য তৈরির মধ্যে দিয়েই সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব। এ কারণেই বিতর্ক চর্চাকে আমি জীবনের এক ব্রত হিসেবে নিয়েছি। তাই তো সৃজনশীল এবং গণমুখী বিতর্ক চর্চার একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। বিতর্ক চর্চার মধ্যদিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই। সেজন্য প্রায় দু’যুগ ধরে এই শিল্পমাধ্যমের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি। বর্তমানে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, জেলা পর্যায়ের বহু বিতর্ক বিষয়ক সংগঠনের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম জাতীয় বিতর্ক উত্সব, নাফিয়া গাজী স্মৃতি বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সার্ক ডিবেট, পাহাড়ি বিতর্ক উত্সবসহ বিভিন্ন আয়োজনের নেতৃত্বও দিয়েছি। বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং এটিএন বাংলায় বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক অনুষ্ঠান আমার হাত দিয়েই শুরু হয়েছে। এটিএন বাংলায় আমার পরিকল্পনা ও সঞ্চালনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিষয়ভিত্তিক একাধিক সংসদীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রচারিত হয়েছে। সর্বশেষ প্রচারিত হলো ‘ইলেকশন ডিবেট’। রম্য বিতর্ক, বারোয়ারী বিতর্ক, ভাষা বিতর্ক, স্বাধীনতা দিবস বিতর্ক, জাতিসংঘ মডেল বিতর্কেরও পথ দেখিয়েছি। মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সর্ববৃহত্ আয়োজন ‘বিতর্কবিকাশ’-এর সঞ্চালক এবং পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি। ‘যুক্তির আলোয় খুঁজি মানুষের মুক্তি’ এই স্লোগানে ‘বিতর্কবিকাশ’-প্রতিযোগিতায় গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ২ হাজার ৫শ ৬০টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২ হাজার ৮শ শিক্ষার্থী এবং ১২ হাজার ৮শ শিক্ষকেরা অংশগ্রহণ করে। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে এত বড় বিতর্ক বিষয়ক অনুষ্ঠানের কোনো নজির নেই। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে আমার উপস্থাপনা ও পরিচালনায় অসংখ্য বিতর্ক বিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে। সেসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষনেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। সাফল্যময় নানা অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছি একাধিক পুরস্কার। আমি বিতর্ক চর্চাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়ার স্বপ্ন দেখি। দেশে অনেক ধরনের ইনস্টিটিউশন থাকলেও বিতর্কচর্চাকেন্দ্রিক কোনো ইনস্টিটিউশন না থাকায় আমি আশাহত। আমি মনে করেন প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে অচিরেই রাজধানীতে একটি জাতীয় বিতর্কশালা বা একাডেমি নির্মাণ করা প্রয়োজন। যে একাডেমি বা ইনস্টিটিউশন থেকে পর্যায়ক্রমে সমস্ত জেলা শহরে তথা সারাদেশে বিতর্ক একাডেমি বা ইনস্টিটিউশন নির্মাণ করা সম্ভব হবে। মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে বিতর্ক চর্চা অন্তর্ভুক্তকরণও তার স্বপ্ন। একই সাথে স্কুলে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত একটি বিতর্ক ক্লাস অনিবার্য করা উচিত। বিতর্ককে নিয়ে যেতে চাই মানুষের কাছে। বিতর্ককে আরও জনপ্রিয় করতে চাই। বিতর্ক বিষয়ক অনুষ্ঠান ছাড়াও আমি এখন নিয়মিত আরটিভিতে সমসাময়িক ইস্যুতে ‘আওয়ার ডেমোক্রেসি’ নামক জনপ্রিয় টকশো উপস্থাপনা করছি। বিতর্ক বিষয় ছাড়াও আমি সমসাময়িক বিষয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণাত্মক লেখা লিখছি দেশের শীর্ষ দৈনিক পত্রিকাগুলোতে।
‘বিতর্ক পরিবর্তনের হাতিয়ার’
একেএম শোয়েব
চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)
প্রমিথিউসের জ্ঞানকে মুক্তিদানের পৌরাণিক আখ্যানের সূত্র ধরে যে সভ্যতার জন্ম, সেই পৌরাণিক আঁতুরঘর গ্রিসেই পোতাগোরাস অথবা সক্রেটিসের হাত ধরেই জন্ম নেয় একটি বাকশিল্প, যার নাম ‘বিতর্ক’। সময়ের হাত ধরে বিতর্ক শিল্পের মুক্ত জাগরণী ঢেউ এসে স্পর্শ করে আমাদের এই চির সবুজ মানচিত্রে। বিতর্কই নির্মাণ করবে উদার, আলোকিত যুক্তিবাদী সমাজ, আলোকিত আগামী নির্মাণে বিতর্কের শাণিত চেতনা ভেঙে ফেলবে সকল বিভাজনের শেকল—এই স্বপ্নগুলো যখন ডানা মেলতে চাইছে মুক্ত আকাশে ঠিক তখনই যুক্তির মুখরতাই সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায় সৃষ্টি হয় ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)। ২০০৪ সালে ‘শোন, যুক্তিই আমার সৌন্দর্য’ স্লোগানকে ধারণ করে সারা বংলাদেশের বিতার্কিকদের সবুজ প্রত্যাশা আর স্বপ্নকে সঙ্গী করে পথ চলতে শুরু করে ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)। প্রান্তজনের মাঝে বিতর্কশিল্পকে ছড়িয়ে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এনডিএফ বিডি-এর প্রথম আয়োজনটি হয় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে। ২০০৫ সালের ২ ও ৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় ১ম এনডিএফ বিডি জাতীয় পার্বত্য বিতর্ক উত্সব ’০৫। সারা দেশ থেকে আসা পনের শ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কণ্ঠে ‘যুক্তির আলিঙ্গনে পাহাড়ের সবুজ ফোটাও তারা নব নব’ স্লোগানে মুখরিত হয় রাঙামাটির উপজাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রকাশিত হয় উত্সব প্রকাশনা ‘জিংকানীর গান’। সেখানে মেলবন্ধন রচনা হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিতার্কিকদের। এরপর দশ বছরের পথচলায় এনডিএফ বিডি আয়োজন করেছে ৭টি সফল জাতীয় বিতর্ক উত্সব। শুধুমাত্র ঢাকা নয়, কুষ্টিয়া, চাঁদপুরের মতো জেলা শহরেও আয়োজিত হয়েছে এ বিতর্ক উত্সব। এসব উত্সব মুখরিত হয়েছে সহস্রাধিক কণ্ঠের প্রাণের উচ্ছ্বাসে। ১৬টি বিভাগীয় বিতর্ক উত্সব সমৃদ্ধ করেছে আমাদের এ পথচলাকে। কখনো সিলেট, কখনো রাজশাহী, কিংবা খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর সবখানেই হয়েছে বিতর্ক শিল্প নিয়ে এনডিএফ বিডি-এর পথচলা। শুধু বিভাগীয় শহরেই নয়; কখনো বগুড়া, ঝালকাঠি এমনকি দিনাজপুরের উপজেলা চিরিরবন্দরে এনডিএফ বিডি আয়োজন করেছে রংপুর বিভাগীয় বিতর্ক উত্সব ’১২। সেখানেই হাজির হয়েছে সহস্র বিতার্কিক। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে ‘যুক্তির সূর্যোদয়ে আসুক মুক্তির সকাল’। ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এনডিএফ বিডি আয়োজন করছে ৩৪টি আঞ্চলিক বিতর্ক কর্মশালা ও উত্সবের। কখনো কক্সবাজার আবার কখনো পাবনা, কখনো বান্দরবান কখনো বা কিশোরগঞ্জ, দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে বিতর্ক শিল্পকে ছড়িয়ে দিতে ছুটে বেড়িয়েছে ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশনের কর্মীরা। এনডিএফ বিডি আয়োজন করেছে ৬টি নারী বিতর্ক কর্মশালা। ইডেন মহিলা কলেজে আয়োজন করেছে নারী বিতর্ক উত্সবের। এসব আয়োজন প্রমাণ দেয় বিতর্কশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে এনডিএফ বিডি রেখেছে কার্যকর পদক্ষেপ।
সংসদীয় বিতর্কের চর্চাকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে এনডিএফ বিডি রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিভিন্ন স্থানে এনডিএফ বিডির কর্মীরা পরিচালনা করেছে শতাধিক সংসদীয় বিতর্কের কর্মশালা। বাংলাদেশে বিতর্ক অঙ্গনে মেডিকেল কলেজগুলোর অংশগ্রহণ ছিল মৃতপ্রায়। সেই অবস্থা থেকে গত ৪ বছরে এনডিএফ বিডি-এর কার্যক্রমের মাধ্যমে আবার প্রাণ পেয়েছে মেডিকেল কলেজগুলোর বিতর্ক চর্চা। এসকেইফ বাংলাদেশ লিমিটেডকে সাথে নিয়ে এনডিএফ বিডি আয়োজন করেছে ৩টি জাতীয় মোডিকেল কলেজ বিতর্ক উত্সব। এরই ধারাবাহিতকায় অনেক সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে তৈরি হয়েছে বিতর্ক ক্লাব। তারা এখন নিয়মিত করছে বিতর্ক চর্চা। এভাবেই এনডিএফ বিডি এগিয়ে চলছে একের পর এক স্বপ্ন পূরণ করে, নতুন স্বপ্ন দেখে, নতুন স্বপ্ন তৈরি করে, নতুন স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রত্যাশায় সবাইকে নিয়ে। আমরা স্বপ্ন দেখি এই বিতর্ক শিল্পের চর্চার মধ্য দিয়েই তৈরি হবে যুক্তিবাদী সমাজ, আলোকিত আগামী।
‘যুক্তি-তর্ক মানুষের
তৃতীয় চোখ খুলে দেয়’
আবদুন নূর তুষার
সভাপতি, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন
আমি প্রায় ৩০ বছর ডিবেটের সঙ্গে আছি, মূলত ডিবেট ফেডারেশনের শুরুটা ছিল সবার মাঝে এই চর্চাটা শুরু করা বা সবার অভ্যাসে পরিণত করার লক্ষ্যে। বিতর্ক একটি শিল্প, একটি মেধা বিকাশের মাধ্যম—এই ব্যাপারগুলোই সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল আমাদের। মূলত বিতর্ক হচ্ছে এক ধরনের বাকশিল্প। সুন্দর এবং হূদয়গ্রাহী কথাগুলো মানুষ যুক্তির আলোকে গানের মতো মুগ্ধ বিস্ময়ে শোনে। বিতর্কের কোনো নির্দিষ্ট কারিকুলাম নেই, নির্দিষ্টতায় বিতর্ককে আটকে রাখা যায় না। বিতর্ক হবে মানুষের প্রয়োজন নিয়ে, বিতর্ক হবে পলিসি নিয়ে, ভবিষ্যত্ নিয়ে। আর এই যৌক্তিক আলোচনা থেকে আমরা সবাই উপকৃত হবো। বিতর্ক করলে নিজেকে চেনা যায়। বিতর্ক শিক্ষারই একটি অংশ। যুক্তি-তর্ক মানুষের তৃতীয় চোখ খুলে দেয়। আলোকিত মানুষ গড়তেও বিতর্ক সহায়তা করে। বর্তমানে প্রায় সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েই ডিবেটিং ক্লাব বা সোসাইটি রয়েছে। তরুণদের পড়াশোনার পাশাপাশি জ্ঞান-সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিতর্ক একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তরুণদের মাঝে বিতর্ক-ভাবনাটা প্রবল। তাদের চিন্তা-চেতনা অন্যান্য বয়সীদের তুলনায় অনেক বেশি সহজ এবং গতিশীল। তাই তরুণরা বিতর্কের নানা বিষয় নিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ এবং যুক্তি প্রদান করতে পারে। যা অনেক সময় অনেক মেধাবী মানুষের মাথায়ও নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগায়। বির্তকে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি একদিকে যেমন নিজেদের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধ ও যোগ্য করে তোলে, তেমনি সমাজ ও দেশের ভবিষ্যত্ নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে।
