বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি এত অবহেলা কেন

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৫
সুজন সাহা। বয়স ৩৫। পেশায় একজন মুদি দোকানদার। শিক্ষাগত যোগ্যতা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। বাড়ি ফরিদপুর। বেতন ১০ হাজার টাকা। কাজ চাল, ডাল, তেল ওজন ও বিক্রি করা। আরেক জন মো. ইমতিয়াজ উদ্দীন খান। বয়স ৩২। পেশায় বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। শিক্ষাগত যোগ্যতা ইংরেজিতে এমএ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বেতন ৮ হাজার ৩ শ টাকা। কাজ শিক্ষিত জাতি গড়া। তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঠককে একটি বিষয় বোঝাতে চেষ্টা করেছি মাত্র। ইত্তেফাকের সচেতন পাঠকেরা নিশ্চয়ই তা বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। দেশসেরা অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে যদি সম্মানজনক সম্মানী না পাওয়া যায় তবে সেটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। আমাদের দেশের একজন রিকশাওয়ালার মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কাছাকাছি। অর্থাত্ একজন শিক্ষকের জীবনযাত্রার মানের সূচক একজন রিকশাওয়ালার তুলনায় অপেক্ষাকৃত নিম্নগামী। রিকশাওয়ালার পেশাকে অসম্মানজনক বা ছোট করে দেখছি না। তবে একথা তো সত্য একজন উচ্চশিক্ষিত মানসিক শ্রম প্রদানকারীর মর্যাদা সর্বাগ্রে হওয়াই প্রত্যাশিত। বর্তমানে কোনো মাধ্যমিক বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিজেকে যোগ্য করতে প্রথমেই একজনকে NTRCA কর্তৃক নিবন্ধনকৃত হতে হয়। এই পরীক্ষায় কৃতকার্যের হার একেবারেই নগণ্য বললে অত্যুক্তি হবে না। এরপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। অনেকেই NTRCA কর্তৃক নেওয়া এই পরীক্ষাকে কাঠিন্যের বিচারে বিসিএস-এর মিনি সংস্করণ বলে থাকেন। অর্থাত্ কম মেধাবীরা ইচ্ছে করলেই এখন আর এ পেশাতে আসতে সক্ষম হচ্ছেন না। অথচ এ পেশায় সুযোগ-সুবিধা একেবারে নেই বললেই চলে। বেসরকারি ব্যাংক, এনজিও-এর তুলনায় এ পেশা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের কাছে কম আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকিং পেশায় আকর্ষণীয় বেতন বোনাস ছাড়াও হাউজ লোন ও কার লোনের সুবিধা রয়েছে। ব্যাংকারদের কার লোন সুবিধা যেখানে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা, সেখানে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ ধরনের কোনো সুবিধার ব্যবস্থাই নেই। হাউজ লোন বাবদ ব্যাংকাররা পেয়ে থাকেন ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। আর এর বিপরীতে শিক্ষকেরা পেয়ে থাকেন ২ লাখ টাকার সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে অত্যন্ত মেধাবীদের তাই এ পেশায় মারাত্মক অনীহা। গণিত, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বাদে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনির কোনো সুযোগই নেই। যদিও বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত পরিসর ছাড়া প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং, গৃহশিক্ষকতা নিষিদ্ধ। শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা না করে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং বন্ধ করায় তা ফলপ্রসূ হয়নি। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। বিগত সরকার আন্দোলনের মুখে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাস্যকর বাড়িভাড়া ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করে। এতে শিক্ষামন্ত্রী গর্ব করে বলেছিলেন তাঁর সরকার শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ৫ গুণ বাড়িয়েছে। টাকার পরিমাণ উচ্চারণ করেননি। বিষয়টি হাসির খোরাক হয়েছিল। রেজিস্ট্রিকৃত সমস্ত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ইতোমধ্যে জাতীয়করণ করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনও। পদমর্যাদাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সারা জীবনে মাত্র একবার স্বপদে থেকে স্কেল পরিবর্তন হয়। বোনাসের ক্ষেত্রেও তাঁরা বঞ্চনার শিকার। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি এরূপ অবহেলা, বৈষম্য কেন—এ প্রশ্নের উত্তর নেই। সারা দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান কিংবা শিক্ষকদের যোগ্যতা যদি সন্তোষজনক না হয় তাহলে সারা দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো নির্বাহী আদেশে বন্ধ করে দেওয়া হোক। তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এ পেশায় ঢুকে আর্থিক কষ্টে ধুঁকে ধুঁকে মরবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনেক অর্থও সাশ্রয় হবে। ফরিদপুর