কলকাতা, দিল্লির চাঁদনি চক, লক্ষৌ, করাচি, লাহোর প্রভৃতি শহরে ইফতারের সময় থেকে সেহরি পর্যন্ত উত্সবের আমেজ বিরাজ করে। পরিবারের মানুষরা যেমন দল বেঁধে সেহরি খেতে হোটেলগুলোতে জমায়েত হন তেমনি হোটেল থেকে খাবার কিনে নিয়ে যাবার চলও বেশ। এরসঙ্গে পাড়া-মহল্লায় আয়োজন করা হয় কাওয়ালি গানের আসর। ফলে জমজমাট হয়ে ওঠে সেসব দেশের মুসলিম সম্প্রদায় বসবাসকারী এলাকাগুলো।
বাংলাদেশেও গত কয়েক বছর ধরে রমজানে সেহরিকে কেন্দ্র করে হোটেলগুলোতে মুখরোচক খাবার বিক্রির সংস্কৃতি সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে সেহরি পর্যন্ত খাবারের দোকানগুলোতে মানুষের যে ভিড় জমছে-এটা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
রাজধানীতেও ধীরে ধীরে উপমহাদেশের অন্যান্য শহরের আদলে সেহরি রাত জমজমাট হয়ে উঠছে। রমজানে দল বেঁধে সেহরি করা রাজধানীর মানুষের জীবনে যোগ করেছে এক নতুন অনুষঙ্গ। আর সে কারণে রাত গভীর হলেও রাজধানীর অনেক হোটেলই থাকে মানুষের আনাগোনায় সরগরম।
ভারতে জন্ম নেওয়া বৈবাহিক সূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক সীমা কালাম সিদ্দিকী বললেন, কলকাতায়, দিল্লীতে এই পুরো রোজার মাস জুড়ে এক উত্সবের আমেজ শুরু হয়। পাড়ায় পাড়ায় চলে কাওয়ালী গানের আসর। আর মুখরোচক খাবারের দোকানগুলো ইফতারের সময় থেকে জমে ওঠে। পাড়ার সব মানুষ বাইরে বেরিয়ে এসে সবার সঙ্গে মিলিত হয়। গভীর রাতে সেহরি শেষে সবাই ঘরে ফেরে।
সেহরি উপলক্ষে রাজধানীর অনেক রেস্টুরেন্টই রাতে খোলা থাকে। তবে সবার মূলত আগ্রহ থাকে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের দিকেই। পোলাও, কাচ্চি বিরিয়ানি, চিকেন বিরিয়ানি, খাসির লেগ রোস্ট এবং রেজালার গন্ধে মৌ মৌ করে ওঠে পুরান ঢাকার অলিগলি। এই মাঝরাতেও পুরান ঢাকার হোটেলগুলোর সামনে প্রাইভেট কারের আনাগোনায় রীতিমত জ্যাম বেঁধে যায়। রাত একটার পর থেকে হোটেলগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। হোটেলের ভেতরে মানুষের হাঁক-ডাক। ওয়েটারদের ব্যস্ত ছোটাছুটি। দল বেঁধে বন্ধুরা মিলে সেহরি করে আর সেই সঙ্গে তাদের আড্ডাও জমে ওঠে। আড্ডার আকর্ষণে, আর মজার মজার খাবারের টানে সবাই এসে জড়ো হয় রেস্টুরেন্টগুলোতে। ফেসবুকে সেহরি করার সেলফি পোস্ট করা যেন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কারো ছবি দেখে অন্য বন্ধুরাও বের হচ্ছেন সেহরিতে। তুলছেন ছবি। সে ছবি ফেসবুকের পেজগুলোতে ভেসে বেড়াচ্ছে।
শুধু আনন্দ করবার জন্যই নয়, মানুষকে প্রয়োজনের তাগিদেও অনেক সময় বাইরে সেহরি করতে হয়। তাই শহর এলাকার অনেক হোটেলই খোলা থাকে রমজানে। তবে একসাথে বন্ধুরা মিলে সেহরি করলেও যাতে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য বজায় থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। হোটেলগুলোতে মসলাদার খাবারের প্রতি মানুষের ঝোঁক বেশি। সাদা ভাতের সঙ্গে মুরগি কারি, ঝাল ফ্রাই, খাসির গ্লাসি, খাশির রোস্ট, বিভিন্ন ছোট বড় মাছ থাকে। এছাড়া কাচ্চি, মোরগ পোলাও তো আছেই। খাবারের পর থাকে মিষ্টি জাতীয় নানা খাবার। ফল, জুস, লাচ্ছি কিংবা শরবত জাতীয় পানীয় প্রভৃতি।
সেহরি পার্টিতে হোটেলগুলো জমজমাট
সেহরির সময় হলেই জমে ওঠে রাজধানীর হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো। বনানি, গুলশান, উত্তরার অভিজাত এলাকার কিছু কিছু রেস্টুরেন্ট খোলা থাকে তবে মানুষের প্রধান আকর্ষণ থাকে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্টগুলোর প্রতি। নওয়াবপুরের হোটেল আল রাজ্জাক, ঠাঁটারি বাজার, ধানমন্ডির স্টার হোটেল, বঙ্গবাজারের সুপার স্টার, রাজধানী হোটেল সেহরি পার্টির জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব হোটেলেই মানুষের আনাগোনা বেশি। এছাড়াও নাজিম উদ্দিন রোড, নাজিরা বাজারেও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী অনেক হোটেল। এদিকে, বেশকিছু কর্পোরেট হাউজ, মিডিয়া হাউজগুলো সেহরি পার্টির আয়োজন করে বেশ সাড়া ফেলেছেন এবছর। দুপুর বারোটার পর থেকেই আনাগোনা বাড়তে থাকে হোটেলগুলোতে। তবে আসল চাপটা আসে রাত একটা থেকে আড়াইটার মধ্যে- বলছিলেন রাজ্জাক হোটেলের ব্যবস্থাপক। তিনি বললেন, মূলত দশ রোজার পরে চাপ বাড়ে। চলে চাঁদ রাত পর্যন্ত।
বনানি থেকে নওয়াবপুরের হোটেল আল রাজ্জাকে সেহরি করতে এসেছে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল। বসার জায়গা নেই তাই বাইরে অপেক্ষা করছেন তারা। এই দলের তানভীর আলম বললেন, হুট করেই চলে এসেছি আমরা। কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। ফোনে ফোনে যোগাযোগ। ভালোই লাগে এইভাবে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতে আর সেহরি খেতে। শুধু বন্ধুরাই নয়, পরিবারের সদস্যদের নিয়েও চলে এসেছেন অনেকে দিনভর রোজা রাখার পর সুস্বাদু খাবারের খোঁজে।
বন্ধুদের সঙ্গে হোটেল আল রাজ্জাকে সেহরি করতে এসেছেন কাকরাইলের বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বললেন, এই গভীর রাতে ঢাকা শহরে কখনোই বের হইনি। সেহরি করার আগে আমরা পুরো ঢাকা শহর, ফ্লাইওভার ঘুরে এসেছি। এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকবে।
