সার্বিক উন্নয়নে চাই বাস্তবমুখী বিনিয়োগ বান্ধব বাজেট

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১৪
আগামী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট গতানুগতিক না করে বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগবান্ধব করার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। শনিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত “আসন্ন বাজেট: প্রতিজ্ঞা ও চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তারা। রাজস্ব আয় বাড়াতে কর হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সুষম উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দেন শিল্প উদ্যোক্তা এবং অর্থনীতিবিদরা। ঢাকা চেম্বারের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত মত বিনিময় সভায় ইআরএফ’র সভাপতি সুলতান মাহমুদের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ড. বিনায়ক সেন, ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন, সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টু, পোশাক উত্পাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদি, আমেরিকান চেম্বারের সভাপতি আফতাব-উল-ইসলাম, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মজিদ হোসেন এবং ঢাকা চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান খানসহ আরও অনেকে। সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সব খাতে কিছুটা বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রতি বছর গতানুগতিক ধারায় বাজেট করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে খাতগুলো ভালো করেছে আর যে খাতগুলো বরাদ্দ দেয়ার পরও কাজে আসছে না তা বিবেচনা করে বরাদ্দ দিতে হবে। বাজেটে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুষম উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সমপ্রসারিত না হলে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পরও দারিদ্র্য বিমোচন হবে না। তবে দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনা সংক্রামক ব্যাধির মতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ব্যাধি গোটা অর্থনীতিকেই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক হতে হবে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ বছর প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের নিচে হবে বলে অনুমান করেছে। এতে করে ১০ বছরের মধ্যে চতুর্থবারের মতো প্রবৃদ্ধির ধারায় পতন ঘটবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে- বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্ব। এই বন্ধ্যাত্ব রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হয়নি। বিনিয়োগে বন্ধ্যাত্ব শুরু হয়েছে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকেই। এজন্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ হলেও দেশে বিনিয়োগ বাড়েনি। বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাড়লে অভ্যন্তরীণ খাতের উপর চাপ বাড়বে। যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলবে। আর অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ করে ব্যয় করার পরিণাম হিসেবে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়তে থাকবে। কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি খুব খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। বেকারত্ব পরিস্থিতি বর্তমানে টাইম বোমার আকার ধারণ করেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে দ্রুত বেকারত্বের হার কমিয়ে আনতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ বান্ধব বাজেট করার পরামর্শ দেন তিনি। ড. বিনায়ক সেন বলেন, মধ্য আয়ের দেশ হলেই দেশের মানুষের গুণগত পরিবর্তন হবে না। তাই আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ, আন্তঃশহর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো ফোর লেন ও আট লেন করার বিষয়ে জোর দেয়ার পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই আমাদের জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। এ খাতগুলোতে ব্যয় সংকোচন করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। আতিকুল ইসলাম বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। বিদেশি ও দেশি কিছু সংস্থা দেশের কারখানা পরিদর্শন করছে। তারা মূলত বাহ্যিক পরিদর্শন চালাচ্ছে। পরিদর্শন দল এ পর্যন্ত এক হাজার ২৯টি পরিদর্শন চালিয়ে ১৬টিতে ত্রুটি পেয়েছে। সেসব কারখানার ১৭ হাজার পাঁচশ’ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। এসব শ্রমিকের অন্যত্র চাকরি হওয়ার মতো পরিবেশও নেই। আগামী চার মাসে এক লাখ শ্রমিক ও পাঁচ মাসে ৫ লাখ শ্রমিক চাকরি হারাবে। তিনি ৭৫৯ শেয়ারড বিল্ডিংয়ে অবস্থিত কারখানা নতুন জায়গায় স্থানান্তরে নির্মাণ সামগ্রীর ওপর কর কমানোর দাবি জানান। এছাড়া বক্তারা বলেন, প্রতি বছর এডিপিতে ১২০০ বা ১৩০০ প্রকল্প নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত অনেকগুলোই বাস্তবায়ন হয় না। টাকার অপচয় হয়। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আরও কম প্রকল্প নিয়ে গুরুত্ব সহকারে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে করহার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো প্রয়োজন।