বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরা তাদের আপন প্রতিভায় উদ্ভাসিত হন সারা বিশ্বের মাঝে। সেই সাথে করেন নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব। তেমনই একজন রন্ধনবিদ খাদ্যবিষয়ক লেখক এবং ব্লগার রেজিনা জুঁই সবুর ক্রস। রান্নাবান্না নিয়ে তার দুই খণ্ডে লেখা রেসিপিবিষয়ক বই ‘গাস্ট্রোগিক : হোয়াট টু ইট হোয়েন ইউআর ইন অ্যা হারি, হাংগ্রি অর হার্ড আপ’ তাকে পৌঁছে দেয় সফলতার শীর্ষে। খ্যাতিমান এই রন্ধনশিল্পী নাম লিখিয়েছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পাওয়ার হানড্রেডে। এছাড়া ‘গাস্ট্রোগিক’ তার ব্লগটিও বিশ্বের নানা মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রজন্মের এই সফল নারীকে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
যিনি রাঁধেন, তিনি নাকি চুলও বাঁধেন। বাঙালি নারীদের সাথে রান্নাবান্নার একটি দুর্দান্ত যুগলবন্ধি আমাদের ঐতিহ্যগত প্রথা হয়ে আছে। সময়ের সাথে সাথে এই শিল্পটি রান্নাঘরের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে গেছে সকলের মাঝে। নিত্য নতুন রান্নার রেসিপি এখন দৈনন্দিনের নিত্য ব্যবহার্য বিষয়। আর এই রান্না নিয়ে চলে নানা আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণা। তেমনই একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পী তার রান্নার নানা মেধাবী কৌশল এবং মজাদার রেসিপি দিয়ে পৌঁছে গেছেন সফলতার শীর্ষে। বিশ্বজুড়ে সকলের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন বাঙালি এবং এশিয়ার রান্নাবান্নার নানা রেসিপি। তুমুল জনপ্রিয় এই রন্ধনশিল্পীর নাম রেজিনা জুঁই সবুর ক্রস। ব্রিটেনে তার জন্ম হলেও ইস্ট লন্ডনে বাঙালি ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। প্রবাসী বাবা-মায়ের বাঙালিয়ানা পরিবেশে রেজিনার বেড়ে ওঠা আমাদের নিয়মিত বাঙালি মেয়েদের মতোই। আর বাঙালি মেয়েদের মতোই ছোটবেলা থেকে রান্নায় ছিল তার ব্যাপক শখ। আর বরাবরই রান্নায় উত্সাহী মায়ের সাহচর্য রেজিনার এই শখকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়। তার শৈশব-কৈশোরের পুরোটাই মায়ের সাথে রান্না নিয়ে নানা খুনসুটি করেই কেটেছে। বেড়ে ওঠার গল্পে রেজিনা তার ব্লগে লিখেন, ‘আমি সত্যিই অনেক কম বয়সে রান্না করা শিখেছি। আমার মায়ের রান্নাঘরের কাজকর্ম দেখে আমি অনেক প্রভাবিত হয়েছিলাম (অধিকাংশ এশিয়ান গৃহিণীর মতো তিনিও আমাদের জন্য প্রতিদিন তাজা খাবার রান্না করেন) এবং আমার এখনও মনে পড়ে যে, মায়ের চড়ানো বিশাল মুরগির তরকারির পাত্র চেয়ারের উপর দাড়িয়ে বড় নাড়ানি দিয়ে তার সাথে নাড়তাম। আর মাও আমাকে প্লে-ডো দিয়ে খেলার পরিবর্তে পরোটা, লুচি বানাতে দিতো।’
স্কুল-কলেজ পেরিয়ে ফুড অ্যান্ড ড্রিংক জার্নালিজমে অনার্স পাস করেন রেজিনা। পরবর্তীতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করেন ব্রডকাস্ট জার্নালিজমে। খাদ্যবিষয়ক এক টেলিভিশন প্রোগ্রামে গবেষক হিসেবে রেজিনা তার কর্মজীবন শুরু করেন। কিছুদিন পর চলে যান জাপানে। নানা ধরনের জাপানি খাবারের রেসিপি শেখেন সেখানে। বরাবরাই ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর দিকে তার নজর ছিল বেশি। ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর রেসিপি শিখে নেন লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে। তার গড়ে তোলা ‘গাস্ট্রোগিক’ (www.gastrogeek.wordpress.com) নামে খাদ্যবিষয়ক ব্লগটি ইতিমধ্যেই ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। ২০০৯ সালের দিকে রেজিনা তা শুরু করেন। সাদামাটা ব্লগটিতে খুব বেশি জাঁকজমক নেই, আছে নানা ধরনের মেধাবী হাতের তৈরি রেসিপি এবং তার ছবি। তারপরও বিশ্ববাসীর কাছে ব্লগটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। কর্মজীবনের শুরুতে নামকরা কয়েকজন রন্ধনবিদের সঙ্গে রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠানে গবেষকের কাজ করেছেন রেজিনা। যেখানেই গিয়েছেন, যে ধরনের খাবারই চেখে দেখেছেন তারই রন্ধন প্রণালি সম্পর্কে জেনেছেন। খাবারদাবার ও রান্নাবান্না নিয়ে তার এই কৌতূহল এবং গল্পের ভাণ্ডার তাকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছে। ‘গাস্ট্রোগিক’ ব্লগটিতে নানা ধরনের খাবারের রেসিপি দিয়েছেন রেজিনা। বিশেষ করে এশিয়ান ও আদিবাসী রেসিপির জন্য ব্লগটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরই মধ্যে কখনও কখনও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের রেসিপি দিয়েও তিনি সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারগুলোর সাথে। বাঙালি রান্না সম্পর্কে রেজিনা তার ব্লগে লিখেন, ‘মশলা, মশলা এবং আরও মশলা! মশলার চতুর ব্যবহারই বাঙালি রান্নার আসল চাবি।’ খাদ্য অপচয় করার ক্ষেত্রে রেজিনা জানান, ‘আমি মনে করি আমরা এমন একটা জাতি হয়ে দাঁড়িয়েছি যারা খাদ্য অপচয়কারী। এটা আসলেই লজ্জাকর, আর এর প্রধান কারণ হিসেবে আমি মনে করি আমরা খাবারের সাথে যথেষ্ট অর্গানাইজড না। এ ছাড়াও, আমরা সবসময় খাবার অপচয় না করতে অনুত্সাহ বোধ করি। রান্নার প্রোগ্রামে দেখা যায় কম হয়ে যাবে এমন ভয়ে অনেক রান্না করা হয়, কিন্তু শেষমেশ অনেক অনেক খাবার বেঁচে যায়। ফেলে দেওয়া ওই মজাদার খাবারগুলো দেখা যাবে অনেক মানুষেরই মিল হয়ে যেত।’
এলবিসি রেডিওর জনপ্রিয় উপস্থাপক টম পার্কার বোলস তার শোতে রেজিনাকে হাজির করেন। রবার্ট এলমাস বিবিসি লন্ডন ৯৪.৯-এ তার শোতেও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে নিয়ে আসেন রেজিনা সবুরকে। এছাড়া দ্য ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড, রেড ম্যাগাজিন, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, অলিভ, অ্যামিলিয়াস ম্যাগাজিন এবং ওয়েটরোজ কিচেনে তাকে নিয়ে ফিচার করা হয়। রান্নাবিষয়ক প্রতিযোগিতা ‘ব্রিক লেন কারি’ কম্পিটিশনে বিচারক হিসেবে ছিলেন তিনি। গিয়েছিলেন ইউকে টিভির ‘দ্য পারফেক্ট’ এবং চ্যানেল ৪-এর জেমি অ্যান্ড জিমিস ফুড ফাইট ক্লাব প্রতিযোগিতায়ও। বর্তমানে রেজিনা দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি গুড ফুড, চ্যানেল ৪ ফুড, লে কুল, ফর্ক ম্যাগাজিন, ইট মি ম্যাগাজিন এবং ফায়ার ও নাইফস ফুড কুয়াটারলির বিভিন্ন পাবলিকেশন্স ওয়েবসাইটে রান্নাবিষয়ক নানা লেখালেখি করেন।
কম পয়সায় ভালো মুখরোচক খাবার তৈরি করা যায়, সেসবের রেসিপি নিয়েই ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘গ্যাস্ট্রোগিক :হোয়াট টু ইট হয়েন ইউ আর ইন অ্যা হারি, হাংগ্রি অর হার্ড আপ’। বইটি প্রকাশ করেছে কেলি বুকস। পরে এ বইটির আরও একটি খণ্ড লিখেছেন তিনি। যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। ব্রিটেনের বিখ্যাত দৈনিক ডেইলি মেইল বইটিকে সপ্তাহের সেরা বই হিসেবে নির্বাচিত করে। এ বছরের ১ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি রেজিনা অংশ নেন ব্রিটেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম চেইন সুপারমার্কেট ‘সেইন্সবুরি’র ছয় সপ্তাহের প্রচারাভিযানে। দেড় মাসের এই প্রচারাভিযানের শিরোনাম ছিল—‘মেইক ইউর রোস্ট গো ফারদার’।
ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী জো ক্রস এবং একমাত্র ছেলে আইভান ইউসেফ সবুর ক্রসকে নিয়ে রেজিনার পারিবারিক আবহ। রেজিনার নামের সঙ্গে জো পদবিটা স্বামীর কাছ থেকেই পাওয়া। নিজের হাতে বাজার করতে ভালোবাসেন রেজিনা। নিজের পছন্দ অনুযায়ী তরিতরকারি এবং পত্রিকা কিনে বাসায় ফেরেন তিনি। সাধারণত ছুটির দিন রবিবার রেজিনা সাড়া সপ্তাহের জন্য যতটা পারেন রান্না করে রাখেন। কারণ অন্য দিনগুলোতে ছেলেকে দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকায় খুব বেশি রান্না করতে পারেন না। কিন্তু ছুটির দিনে স্বামীর কাছে থাকে আইভান। এমনইভাবে কেটে যায় রেজিনা জুঁই সবুর ক্রসের পুরো সপ্তাহ। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এই সফল খাদ্যবিষয়ক লেখিকা, রন্ধনবিদ এবং ব্লগার এগিয়ে যাচ্ছেন আপন গতিতে সাথে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন নিজের ঐতিহ্যের পরিচয়। সফল এই প্রজন্মের জন্য রইল অনেক শুভ কামনা।
