সেট ডিজাইনার

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২০:১১
নাটক বরাবরই সমাজের আয়না হিসেবে বিবেচিত। সমাজের নানা অবয়ব উঠে আসে নাটকের মঞ্চে। আর প্রতিটি নাটকে মঞ্চের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কারণ মঞ্চের শরীরী কাঠামো দর্শকদের মাঝে জাগিয়ে তোলে নাটকের মূল আবহ। এই মঞ্চ যারা তাদের মেধাবী মননের মাধ্যমে গড়ে তোলেন তারা সেট ডিজাইনার হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিত। যাদের মেধাবী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মঞ্চে জেগে ওঠে নাটকের মূল পট। এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন মেধাবী সেট ডিজাইনারদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। আয়োজনটি গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র অনিকেত পাল শৈশব থেকেই সংস্কৃতিক সব কর্মকাণ্ড ভালো লাগত অনিকেত পালের। সেজন্য কৈশোরেই শিশুমেলা, উদীচী শিল্পগোষ্ঠীসহ আরও কয়েকটি সংগঠনের সাথে যোগ দেন তিনি। সেই থেকেই স্বপ্ন দেখতে থাকেন নিজেকে এ অঙ্গনের একজন করে নেবেন কোনো একদিন। আর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বিকম শেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যকলা বিষয়ের উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে দেখা যায় তাকে। কিন্তু ততদিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠীর সাথে জড়িয়ে যান তিনি। রূপকার নাট্যগোষ্ঠীতে কাজ করার মাধ্যমেই প্রথম কোনো নাট্যগোষ্ঠীর সাথে কাজ করেন তিনি। তবে রূপকার নাট্যগোষ্ঠী বেশিদিন স্থায়ী না হওয়ার দরুণ পরবর্তীতে সমীকরণ নাট্যগোষ্ঠীর সাথে কাজ করতে দেখা যায় এই ডিজাইনারকে। কিন্তু এখানেও তার সম্পৃক্ততা বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। ১৯৯৫ সালে পেশাগত কাজে তাকে চলে আসতে হয় ঢাকাতে। ঢাকাতে চাকরি করার পাশাপাশি তাকে বিভিন্ন নাট্য সংগঠন সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে দেখা যায়। সেই সূত্র ধরেই ২০০২ সালে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঢাকাতে তৈরি করেন পালাকার থিয়েটার। তারপর থেকেই তাকে নাট্য সংগঠনের সাথে বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করতে দেখা যায়। যার ফলে নাট্য অভিনয়, ডিরেকশন, কোরিওগ্রাফি, সেট ডিজাইন মাধ্যমগুলোতে তার উপস্থিতি দেখা যায় লক্ষণীয়ভাবে। তার নির্দেশনায় ইতোমধ্যেই—স্বপ্নে সন্ধ্যানীল, বাঙালির উত্সব, তোমাকে পাওয়ার জন্য, দোলা, রিফ্লেকশন, সখিপুর গ্রামসহ আরও কয়েকটি নাটক সম্পন্ন হয়। কোরিওগ্রাফিতেও এর মধ্যে তার বিচরণ ছিল অনেকাংশেই। অনিকেত পালের কোরিওগ্রাফিতে নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, নোরার তিন কন্যা, ৫২ বাজার ৫৩ গলি, মগজ ধোলাই, আমিনা সুন্দরী, মায়াজাল, মনভুলা, সময়ের প্রয়োজনে, ঋণশোধ, তোতা কাহিনী, মালেকাবানুসহ আরও অনেক নাটক। যার কয়েকটিতে তাকে অভিনয় করতেও দেখা যায়। তবে যেই বিষয়টা তাকে সবসময় আকৃষ্ট করত তা হলো সেট ডিজাইনিং। তাই মনের খোরাক থেকেই তাকে অনেক নাটকে সেট ডিজাইনের উপর কাজ করতে দেখা যায়। যার মধ্যে নোরার তিন কন্যা, বিবি সাব, রক্ত করবী, তোতা কাহিনী, ঋণশোধ, মেলা, বাংলার মাটি বাংলার জল, রথের রশি ও নারী উল্লেখযোগ্য। এর বাইরেও বিভিন্ন ইভেন্ট এবং টেলিভিশনে সেট ডিজাইনে কাজ করতে দেখা যায় এই সেট ডিজাইনারকে। নিজের এ কাজের পাশাপাশি কথা হয় নতুনদের সম্পর্কে। নতুনদের এ বিষয়ে কেমন চাহিদা এবং যারা এ অঙ্গনে আসছে তারা কেমন করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনকার প্রজন্মের তরুণরা সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি দারুণ আগ্রহী। তাছাড়া অর্থনৈতিকভাবেও এ ক্ষেত্রটাতে যথেষ্ট পরিপক্বতা তৈরি হয়েছে আগের চেয়ে।’ চট্টগ্রামের সবুজ কোলাহলে এই সেট ডিজাইনারের শৈশব ও কৈশোর কাটে। পরিবারের চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ। বর্তমানে তার নিজের পরিবারে আছে তার স্ত্রী এবং দু্ই কন্যা। নিজের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে সেট ডিজাইন ও কোরিওগ্রাফিতে ভালো কিছু কাজ করতে চাই এবং একটা প্রফেশনালি থিয়েটারের স্বপ্ন দেখি যেখানে সেট ডিজাইনার থেকে শুরু করে সবাই প্রফেশনালি কাজ করবে।’ অনিকেত পাল ডাকনাম :বাবু জন্মতারিখ ও স্থান :১ অক্টোবর, চট্টগ্রাম মায়ের নাম :শান্তিরানি পাল বাবার নাম :আরবিন্দ বিকাল পাল প্রথম স্কুল :মডেল কেজি স্কুল প্রিয় মানুষ :মা প্রিয় পোশাক :টি-শাট, প্যান্ট অবসর সময় কাটে যেভাবে :বই পড়ে, পরিবারের সাথে সাফল্যের সংজ্ঞা :ভালোলাগাকে ভালোবেসে করতে পারলেই সাফল্য আসে। ০০০ ওয়াসিম আহমেদ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসার একটা ইচ্ছে তার মধ্যে কৈশোর থেকে বেড়ে ওঠে। তবে এ পথে হাঁটা শুরু করেন এইচএসসি পাসের পর। প্রথমে বৈকুণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমির সাথে যুক্ত হন। কিন্তু তিনি নাটক করতে চাইতেন। বিভিন্ন নাট্য সংগঠন সম্পর্কে খোঁজ নিতে থাকেন। আবার তার মনের ভেতরে ঢাকা থিয়েটারে কাজ করার একটা বীজ অঙ্কুরিত হয়। কয়েক বছরের অপেক্ষার পর ২০০৩ সালে ঢাকা থিয়েটারের সাথে যুক্ত হন তিনি। নতুন পথচলা শুরু হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পেছনের মানুষ তিনি। তাকে পাদপ্রদীপের আলোয় দেখা যায় না। ডিজাইন ও নির্দেশনা কাজের সাথে যুক্ত। যৌথভাবে একটি আবৃত্তি ও একটি পথ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন। অসংখ্য আবৃত্তি প্রযোজনার আলোক পরিকল্পনা ও মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন। নাটকের ক্ষেত্রে ঢাকা থিয়েটার ছাড়াও তিনি অন্য সংগঠনের আলোক পরিকল্পনা করেন। পেছনে কাজ করার মধ্যে আনন্দ লুকিয়ে আছে বলে মনে করেন এই মঞ্চ কর্মী। যেহেতু তিনি মঞ্চ নাটকের সাথে জড়িত, সেই ধারণা থেকে তিনি জানালেন, বাংলাদেশে মঞ্চ নাটকের কর্মকাণ্ড এখনও পেশা হয়ে উঠেনি। বিশ্ব অর্থনীতির এই অবস্থায় অবশ্যই মঞ্চ নাটককে একটি পেশাদারী রূপ দিতে হবে। তবেই আমাদের মঞ্চ নাটক অনেক দূর এগিয়ে যাবে। নতুনদের জন্য পরামর্শ চাইলে তিনি জানালেন, ‘সাফল্যের শর্ত হচ্ছে কাজ, কাজ এবং কাজ।’ তিনি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করেন এ কারণে যে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের একটি গ্রামে। এক অদ্ভুত রঙিন জীবনের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। এই কৈশোর ও শৈশবের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাই তাকে টেনে নিয়েছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির পথে। পরিবারে তারা তিন ভাই। তিনি সবার বড়। তার পরিবারের অকণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থনের কারণেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার পথচলাটা অনেক সহজ হয়েছে বলে জানালেন এই তরুণ মঞ্চকর্মী, যিনি স্বপ্ন দেখেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশের। ওয়াসিম আহমেদ জন্মতারিখ ও স্থান :২ ডিসেম্বর, নীলফামারী মায়ের নাম :ওয়াহিদা বেগম বাবার নাম :ফয়জুর রহমান প্রথম স্কুল :ওসমান গণি মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :বাবা-মা ও শিল্পগুরু নাসির উদ্দীন ইউসুফ সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম ছাড়া সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। ০০০০ জুনায়েদ ইউসুফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিষয়ে পড়তেন। ১৯৯১ সালে নাট্যচক্র পরিচালিত নাট্যশিক্ষাঙ্গনে নাট্য বিষয়ে এক বছরের সার্টিফিকেট কোর্স করলেন হঠাত্। কোর্স করাকালীনই নাটকের নেপথ্যের কাজে আগ্রহবোধ করেন। বিশেষত সেট ও লাইটিং। পরে কোর্স শেষে নাট্যচক্রে নাট্যকর্মী হিসেবে যোগ দেন এবং দলের প্রযোজনাসমূহের নেপথ্যের কাজগুলো করতে থাকেন। ১৯৯৩ সালে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত ও কামরুজ্জামান রুনু পরিচালিত একটি লাইটিং ডিজাইন কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন ও পরবর্তীতে থিয়েটার স্কুল আয়োজিত ও মোস্তফা মনোয়ার পরিচালিত একটি সেট ডিজাইন কর্মশালা করেন। এর পর থেকে দলের কাজ ছাড়াও অন্যান্য দলের সাথে কাজ করতে থাকেন। বিদেশি দুজন ডিজাইনারের দুটি কর্মশালা তাকে এ বিষয়ে সিরিয়াসলি কাজ করবার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। একটি হচ্ছে ১৯৯৬ সালে নরওয়ের লাইটিং ডিজাইনার কুর্ট হারমেনসন পরিচালিত লাইটিং ডিজাইন কর্মশালা। অন্যটি হচ্ছে, ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ সেট ডিজাইনার এস ডেভলিন পরিচালিত সেট ডিজাইন কর্মশালা। পপ আর্ট নামে তার নিজের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার তিনিই স্বত্বাধিকারী। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি গ্রাফিক ডিজাইন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, সেট ডিজাইন, আর্ট ডিরেকশন, সিনোগ্রাফি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন বিষয়ক সেবা দিয়ে থাকেন। এ কাজে আনন্দ পান তাই এ কাজেই জড়িয়ে আছেন। তা ছাড়া স্বাধীন ভাবে, সৃজনশীলতার সাথে কাজ করার সুযোগ এতে রয়েছে। যেটা জীবনে খুব জরুরি বলে মনে হয়েছে তার। সফলতা-বিফলতা ভেবে কাজ করেননি কখনও। ডিজাইনের কাজ করতে দারুণ আনন্দ পান, কাজেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এ পেশায়। কাজের ক্ষেত্রের কথা জানাতে গিয়ে তিনি জানালেন, বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো, বিভিন্ন ইভেন্ট, চলচ্চিত্র ইত্যাদিতে ডিজাইনার, বিশেষত আর্ট ডিরেক্টর ও সিনোগ্রাফার অত্যন্ত জরুরি ব্যক্তি। ক্রমশই আমাদের দেশে এ সমস্ত পেশার গুরুত্ব বাড়ছে। থিয়েটারে পেশাদারিত্ব তৈরি হলে এর গুরুত্ব ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে। কাজ করতে করতেই এ ধরনের একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অথচ সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে পারা তার জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট বলে জানালেন তিনি। খুব ছোটবেলা থেকেই হোস্টেলে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। বাবা ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বদলির চাকরি। তাই ছোটবেলাতেই রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তাই তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি বলতে তার স্কুল ও হোস্টেল জীবন। তার বর্তমান কাজের ক্ষেত্র তৈরিতে থিয়েটারের অবদান সর্বাধিক। তিনি স্বপ্ন দেখেন থিয়েটারেও একসময় পেশাদারিত্ব তৈরি হবে। অবশ্য সেই লক্ষ্যে তিনি নিজেও কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি রেপার্টরি ধারায় তারা কয়েক জন মিলে একটি নাট্য সংগঠন গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে থিয়েটারকে পেশা হিসেবে উন্নত করার চেষ্টা করছেন। জুনায়েদ ইউসুফ ডাকনাম :জুনায়েদ জন্ম তারিখ ও স্থান :১০ আগস্ট, ১৯৭১, ঢাকা মায়ের নাম :জিন্নাতুন নেছা বাবার নাম :এ কে এম ইউসুফ প্রথম স্কুল :ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল প্রিয় মানুষ :বাবা ও মা প্রিয় উক্তি :বেঁচে থাকাটাই আনন্দের প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি, ট্রাউজার, সেন্ডেল অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, ইন্টারনেটে বিভিন্ন তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :জানার আগ্রহ বজায় রাখা।