পুষ্টিবিদ হিসেবে পেশা গ্রহণ এখনও সবার কাছে সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। খুব কম সংখ্যক মানুষ এই বিষয়ে অধ্যয়ন করার সুযোগ পান এবং এই পেশায় আগ্রহী হন। অনেকেই জানেন না এই পেশার মাধ্যমে কীভাবে দেশের মানুষের এবং নিজের পুষ্টি সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করা যায়। যদিও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানে অনেকে এই পেশায় কাজ করছেন কিন্তু সরকারি পর্যায়ে এখনও পুষ্টিবিদ হিসেবে সবক্ষেত্রে পদ সৃষ্টি হয়নি। এই পেশার গুরুত্ব, কার্যকারিতা ও এই পেশা সম্পর্কে নিজেদের প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন দেশবরেণ্য কয়েকজন পুষ্টিবিদ
তা মা ন্না চৌ ধু রী
প্রিন্সিপাল ডায়েটেশিয়ান, অ্যাপোলো হসপিটালস, ঢাকা
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান হচ্ছে এমন এক ধরনের শিক্ষা যার জ্ঞান ঘরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই প্রয়োগ করা যায়। পেশাগত জীবনে একাডেমিক জ্ঞানগুলো কাজে লাগানো যায়, পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঠিক, পরিমিত ও সুষম ডায়েট নিশ্চিত করতে সহায়তা করা যায়। সুতরাং প্রত্যেকেই পুষ্টি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করলে পারিবারিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারলে বলে প্রত্যাশা করেন তামান্না। শুরুর দিকটাতে মানুষ বুঝত না আসলেই এই পেশার চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা কতখানি। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগলেও এখন তিনি অনেক বেশি আশাবাদী। তিনি আশা করেন যেকোনো রোগ থেকে ভালোভাবে মুক্তি পেতে চাইলে প্রত্যেকেই একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেবেন। ডাক্তাররাও রোগীদের যোগ্য পরামর্শের জন্য পুষ্টিবিদদের কাছে পাঠাবেন। যারা এই পেশায় নতুন এসেছে তারা তাদের কাজের মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ করে রোগী ও ডাক্তারদের আস্থা অর্জন করবেন বলে প্রত্যাশা তার। তিনি জানালেন, দেশের বাইরে প্রতিটি হাসপাতালে অবশ্যই একজন পুষ্টিবিদ থাকেন। কারণ রোগী যেকোনো ধরনের চিকিত্সা নিক না কেন তাকে পুষ্টিবিদের কাছে যেতেই হয়। একজন পুষ্টিবিদই পারেন একজন রোগীকে সঠিকভাবে গাইড করতে। বাংলাদেশে পুষ্টিবিদদের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি কাজের ক্ষেত্রও কম। কিন্তু তিনি প্রত্যাশা করেন এই পেশার উন্নতির জন্য এবং সেবার মান আরও বাড়ানোর জন্য সরকার প্রতিটি হাসপাতালে বা যেখানেই চিকিত্সা সেবা দেওয়া হয়, সেখানে যেন একজন পুষ্টিবিদকে অবশ্যই রাখার উদ্যোগ নেবে। তাহলেই চিকিত্সা সম্পূর্ণ হবে এবং জনগণ আরও বেশি সুবিধা পাবে।
০০০
আ বু ব ক র সি দ্দি ক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়েট সলিউশন বাংলাদেশ লিমিটেড
তার মতে দেশে এখন পুষ্টিবিদের চাহিদা অনেক। আগামী প্রায় এক দশক এই চাহিদা বাড়বে বৈ কমবে না। দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো তাদের চাহিদা মতো দক্ষ পুষ্টিবিদ পাচ্ছে না। মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই দিন আর খুব বেশি দূরে নয়, যখন মানুষ ডাক্তারদের মতো পুষ্টিবিদদের কাছেও ভিড় জমাবে পরামর্শের জন্য। পুষ্টি সেবা খাত আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বেশ সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে আবির্ভূত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আশা করেন তরুণরা এই পেশায় আসবে কারণ এটা বেশ ক্রিয়েটিভ ও চ্যালাঞ্জিং একটি পেশা। দেশের মানুষের সেবা করার পাশাপাশি এই পেশা থেকে আয়ও অনেক ভালো। এছাড়া নিজেকে মেলে ধরার, নতুন কিছু করার সুযোগ এই পেশায় অনেক বেশি। পদক্ষেপ হিসেবে সরকার বিসিএস-এ পুষ্টিবিদদের জন্য আলাদা কোনো কোটার ব্যবস্থা করবে বলে আশা করেন তিনি। তার আশা পেশাজীবী হিসেবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের মতো পুষ্টিবিদদের প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে সরকার মনযোগী হবে এবং এ পেশাটিকে আগামী প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের প্রতি প্রত্যাশা সম্পর্কে আবু বকর, ‘তারা যেন দেশের মানুষের কথা ভুলে না যায়। সবাই যেন তার স্ব-স্ব জায়গা থেকে দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য কিছু না কিছু কাজ করে। প্রত্যেকে যদি একটু একটু করে কাজ করে তাহলে তা সম্মিলিতভাবে একটি জাতির জন্য অনেক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ’
০০০
মা হ ফু জা মো বা র ক
প্রভাষক, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
পুষ্টিবিদ হিসেবে দেশের মানুষের জন্য অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে অনেক কাজ করা যায়। মাহফুজা আশা করেন, ভবিষ্যতে ছাত্রছাত্রীরা পুষ্টিবিজ্ঞানে শিক্ষা গ্রহণে আরও এগিয়ে আসবে। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করবে। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক বহু খাতে পুষ্টিবিদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং একজন পুষ্টিবিজ্ঞানের ছাত্রের কাজ করার বহুমুখী সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন খাত এই পেশার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে । তিনি আশা করেন ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে পড়ার যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হবে। এই পেশার মাধ্যমে নিজের, পরিবারের এমনকি জনগণের খাদ্য সম্পর্কিত সচেতনতা বাড়ানো যাবে, রোগ হওয়ার আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া গবেষণার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। তরুণদের মধ্যে যারা সামাজিক উন্নয়নমূলক গবেষণাধর্মী কাজে আগ্রহী তারা এই পেশায় আসবেন বলে প্রত্যাশা তার। তিনি মনে করেন একটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তখনই উন্নত হবে যখন জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের এইদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রথমত, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পুষ্টিবিদের পদ সৃষ্টি করতে হবে।
