দেশে যক্ষ্মায় আক্রান্ত শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক। তবে প্রকৃত পরিসংখ্যান এখনও হাতে নেই বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। শিশুর যক্ষ্মা সম্পর্কে অসচেতনতা কিংবা তাদের যক্ষ্মা হয় না এমন ধারণা অনেক শিশুর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। যক্ষ্মাক্রান্ত শিশুর ক্ষুধামন্দা হওয়ায়, ক্রমেই ওজন কমে কঙ্কালসার হওয়া, হাড় ও মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়া, চিকিত্সা না হলে ফুসফুস থেকে মস্তিষ্কে ইনফেকসন হওয়ার কারণে শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কাও আছে বলে জানান বিশেষজ্ঞগণ।
তাদের মতে, বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত চিকিত্সা গ্রহণ করলে শিশু পায় সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন। তবে যক্ষ্মা হলে মেয়ে শিশুর বিয়ের সমস্যা হওয়া, যক্ষ্মা ছোঁয়াছে হওয়ায় শিশু বৈষম্যের শিকার হওয়ার ভয় এবং এ রোগ পাপের ফল এমন কুসংস্কারগুলো রোগ নিরাময়ের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন তারা।
সরকার ও ব্র্যাক পরিচালিত ডিরেকলি অবর্জাভ ট্রিটম্যান সর্ট কোর্স-ডটস্ অর্থাত্ সরাসরি তত্ত্বাবধানে ওষুধ খাওয়ানো ডটস কর্মসূচির আওতায় এলে ছয় মাসে সম্পূর্ণ এ রোগ নিরাময়যোগ্য বলে জানান তারা।
২০১২ সালের সরকারি এক পরিসংখ্যান মতে , দেশে ৪৮৩৩ জন শিশু যক্ষ্মা চিকিত্সার আওতায় আছে এবং সে পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৯৭ জন। সে মতে, মোট যক্ষ্মা রোগীর ৩ শতাংশ শিশু। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়, বর্তমানে দেশে মোট যক্ষ্মা রোগীর ৬ শতাংশই শিশু। আর চিকিত্সকের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। এই বিষয় ব্র্যাক হেলথ, নিউট্রেশন এন্ড পপুলেশন বিভাগের সিনিয়র কন্সালটেন্ট ডা. শায়লা ইসলাম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, কোন দেশের মোট যক্ষ্মা রোগীর ৯ থেকে ১০ শতাংশ শিশু হওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী আমাদের দেশের যক্ষ্মাক্রান্ত শিশু যথাযথ শনাক্ত করা যায়নি।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, ঢালকানগর, বাংলাবাজার, জিন্দাবাহর এলাকায় সরেজমিনে জানা যায়, এই এলাকায় ডটস্ আওতায় বর্তমানে ২৯৩ জন শিশু চিকিত্সাধীন আছে (মিটফোর্ড হাসপাতালের তথ্য মতে)। বর্তমানে হাসপাতালে বেশ কয়েকজন যক্ষ্মাক্রান্ত শিশু ভর্তি আছে। হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাজনিন আক্তার বানু্ জানান, তিন সপ্তাহের বেশি কাঁশি, দুই সপ্তাহের বেশি জ্বর, ওজন কমা, তিন মাসের বেশি সময় ওজন না বাড়া, খেলাধুলায় অনআগ্রহ ও নিস্তেজ হওয়া শিশুর যক্ষ্মার লক্ষণ। তিনি আরো বলেন, ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা হলে গলায় গুটি হয়ে ফুলে যায়, গিটেগিটে ফুলে ব্যথ্যা হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা হয়, পেটে পানি এসে ফুলে যায়, ফুসফুস থেকে ব্রেইন ইনফেকসন করে। শিশুর যক্ষ্মা বড়দের চেয়ে একটু আলাদা হয়। প্রথমত তাদের কফ হয় না, তাই কফ পরীক্ষা করা যায় না। ফলে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে রেখেও পরীক্ষা করা হয়। আবার যখন শিশু ঠিক সময় মতো ওযুধ না খেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরে, তখন তাদের হাসপাতালে রেখে চিকিত্সা করা হয়, ডটস্ কোর্সের ওষুধ ওজন নির্ণয় করে দেয়া হয়। শিশু নির্ধারিত ওজনের কম হলে তাকে অন্য চিকিত্সা দেয়া হয়। আবার অনেক সময় যক্ষ্মার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জন্ডিসসহ অন্য সমস্যাও হতে পারে তাই তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়।
ডা. শায়লা ইসলাম বলেন, এক বছর বয়সের নিচে যক্ষ্মাক্রান্ত শিশুদের পানিতে দ্রবণ উপযোগী ট্যাবলেট রেজিস্টার চিকিত্সকের পরামর্শ মতে নির্ধারিত পরিমাণে দেয়া হয়। আমাদের এলাকা ভিত্তিক স্বাস্থ্য সেবিকা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই ওষুধ খাইয়ে আসে। সরকারই আমাদের এ ওধুষ দেয় এবং শিশুর যক্ষ্মা রোগের ওষুধ দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। তিনি বলেন, এই চিকিত্সা সরকারের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়।
গেণ্ডারিয়া মনিজা রহমান স্কুলের দশ বছর বয়সের এক শিক্ষার্থীর ৫ মাস আগে যক্ষ্মা ধরা পড়ে। ডটস্ কর্মসূচির আওতায় এসে সে এখন অনেকটাই সুস্থ। এখন শুধু কোর্স সম্পূর্ণ করার পালা। জিন্দাবাহার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যক্ষ্মা রোগীর মা বলেন, তার সন্তান পাঁচ মাস স্কুলে যায়নি। স্কুলের শিক্ষকদের জানালে তারা স্কুলে আসতে বারন করেন।
এই বিষয় অধ্যাপক ডা নাজনিন আক্তার বানু্ বলেন, শিশুদের যক্ষ্মা ঝুঁকি পূর্ণ হওয়ার কারণ রোগ শনাক্ত করা কঠিন, কিন্তু ছোঁয়াছে না। তিনি আরো বলেন, গর্ভবতী মায়ের যক্ষ্মা হলে তার ডটস্ কোর্স (৬ মাসের ওষুধ সেবন) সম্পন্ন করলে গর্ভের সন্তানের কোন ক্ষতি হয় না। শিশুর যক্ষ্মা নিরাময়ে বাংলাদেশ পেড্রিয়াটিক এসোসিয়েসন ও জাতীয় যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যৌথভাবে চিকিত্সকদের এক ট্রেনিং-এর আয়োজন করেছে বলেও তিনি জানান।
কেন শিশুদের যক্ষ্মা হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বড়দের থেকেই শিশুদের যক্ষ্মা হয়। যেমন বাবা-মার মতো কাছের কারো যক্ষ্মা হলে সাত দিনের মধ্যেই সে পরিবারের শিশুর যক্ষ্মা হতে পারে। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের যে ২২টি দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ। যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন, অপুষ্টি, দারিদ্র্যতা প্রভৃতি সমস্যার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন ( ৮৭ লাখ) লোক নতুনভাবে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ১.৪ মিলিয়ন (১৪ লাখ) লোক এই রোগে মৃত্যুবরণ করছে। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই (৯৮%) বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে ঘটছে।
বর্তমানে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শিশুদের যক্ষ্মা নিরাময়ে কি কি কর্মসূিচ নিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো: আশেক হোসেন বলেন, দেশের মেডিক্যাল কলেজ হাসপতালে শিশুর যক্ষ্মা চিকিত্সার যথাযথ ব্যবস্থা আছে। সরকার বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালেও পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থা চালু করছে। শিশুর যক্ষ্মা উপজেলা হাসপাতালে নির্ণয় করা যায় আমরা সেই ব্যবস্থা করছি।
