উপরের পাইলায় খৈ
নিচের পাইলায় দৈ
রামজাদার মায় মরছে
পানি পাইয়াম কৈ?
ও আল্লা পানি দে রে।
এক খাড়ি হলদি
মেঘ আয় জলদি
কচু পাতার পানি টলমল করে
মার চোখের পানি বুক ভাইস্যা পড়ে
ও আল্লা পানি মিলা রে।
মেঘায় কান্দে মেঘির লাইগ্যা
সর্বলোকে কান্দে পানির লাইগ্যা
ও আল্লা মেঘ দে রে।
আমার ছেলেবেলায় প্রায়ই চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ প্রচণ্ড খরায় পুড়তো চারপাশ। এমনও হতো যে লম্বা সময় ধরে বৃষ্টি হতো না। বৃষ্টির জন্য চারিদিকে হাহাকার। মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন হতো। কাঠফাটা রোদে পিপাসায় কাতর হতো মানুষ, পশুপাখি সবাই। ঠিক সেই সময় গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই গীতটি গাইতাম। বাঁশ দিয়ে তৈরি চালনিতে হাইচ্যা শাক ও কলমি শাকসহ কয়েকপদের শাকপাতা, দূর্বাঘাস, জবা ও গাঁদাসহ কয়েকরকম ফুল সাজিয়ে আমরা যেতাম গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন গেরস্থ বাড়িতে। চালনি মাথায় শিশু-কিশোরের দল বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে এই গীতটি গাইতাম। গীত চলা অবস্থায় বাড়ির বৌ-ঝিরা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কলসি থেকে পানি ছিটিয়ে দিতো চালনির ওপর, আমাদের শরীরে। সঙ্গে কোনো গেরস্থ বাড়িতে উপরি হিসেবে পাওয়া যেতো চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও রসুনসহ রান্নার নানা উপকরণ। গীত গাওয়া শেষে প্রাপ্ত সেসব খাদ্যসামগ্রী খিচুড়ির মতো রান্না করে খাওয়া হতো চড়ুইভাতি স্টাইলে। মানুষ বিশ্বাস করতো এভাবে গীত গাইলে বৃষ্টি হবে। আর অবাক করা বিষয় ছিল, যখনই এই গীত গাওয়া হতো, প্রায় প্রতিবারই অবধারিতভাবে বৃষ্টিও নামতো। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে, কয়েক বাড়িতে গীত গাওয়ার পরই বৃষ্টি নেমেছে। তখন অবশ্য চড়ুইভাতির আয়োজনে কমতি পড়তো। কারণ বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাই গীত গাওয়া আর এগুচ্ছে না। তখনকার দিনে কেন এমন হতো? আমার ধারণা তখন মানুষের মধ্যে সততা ছিল। প্রকৃতির প্রতি মানুষ সদয় ছিল। তাই প্রকৃতিও মানুষের ডাকে সাড়া দিতো।
এখন দিন বদলে গেছে। আমরা অমানুষে পরিণত হয়েছি। আমি দেখেছি, প্রতি বছরই পহেলা বৈশাখের দিনে বিশেষ করে বিকেলে বা সন্ধ্যার দিকে ঝড়-বৃষ্টি হতো। পহেলা বৈশাখের দিন বৃষ্টি হবেই এটাই যেন প্রকৃতির আবশ্যিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা ধরেই নিতাম, যেহেতু পহেলা বৈশাখ তাই ঝড়-বৃষ্টি হবেই। হোক সেটা দিনে কিংবা রাতে। অনেক সময় সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েই ঘর থেকে বেরুতাম। বিগত কয়েক দশকে পহেলা বৈশাখের দিন বৃষ্টি হয়নি, এমনটা আদৌ মনে করতে পারছি না। এবারই এর ব্যতিক্রম দেখলাম। প্রকৃতি কি তাহলে আমাদের ওপর থেকে কৃপাদৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো? হবে হয়তো। এত অত্যাচার করেছি প্রকৃতির ওপর, তারও তো সহ্যের একটা সীমা আছে, তাই না?
আজ বৈশাখের ১৭তম দিন। এর মধ্যে দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। তারপরও প্রচণ্ড তাপদাহে পুড়ছে গোটা দেশ। সারা দেশের মানুষ বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের সীমা নেই। খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। উত্তরবঙ্গে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। রাজশাহীতে আমবাগানে অতিগরমে আমের কলি ঝরে পড়ছে। এভাবে আরো মাসখানেক চললে অবস্থা কী দাঁড়াবে ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লোডশেডিং। উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুত্ ঘাটতি ছয়শ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। ভয়াবহ অবস্থা চারিদিকে। অসহ্য হয়ে উঠছে জীবন যাপন। প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের মেজাজ খিচড়ে গেছে। সহনীয় তাপমাত্রায় যা উপেক্ষা করা হতো তেমন সামান্য বিষয় নিয়েও প্রায়ই ঝগড়া বেধে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আবারও গ্রামে গিয়ে বৃষ্টির জন্য গীত গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে। যদিও আমাদের অমানুষিক অত্যাচারে ক্ষত-বিক্ষত প্রকৃতি এখন আদৌ মুখ তুলে চাইবে কিনা এব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান আমি। তবু আশায় বুক বাঁধতে ক্ষতি কী? এত সবের পরও ভবিষ্যতে ভালো কিছু হবে তেমন আশা নিয়েই তো বেঁচে আছি।
ঢাকা
