আমরা দৃষ্টান্ত হবো

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪১
‘মানুষকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে কলমের মাধ্যমে।’ কলমের আশ্রয় বই। বইয়ের আশ্রয় লাইব্রেরি। বই পড়া, লাইব্রেরি গড়া যে ভালো কাজ—তা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা নিষপ্রয়োজন। কারণ সব পথের সব মতের মানুষই তা স্বীকার করবেন। তবে শর্ত প্রযোজ্য। যেমন কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনায় এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বললেন, ‘তোমরা ছাত্রজীবনে মাদক ও গল্প-উপন্যাসের বই থেকে দূরে থাকবে।’ উপদেশ বিফল আশঙ্ক্ষায় তিনি অভিভাবকদের সতর্ক করে বললেন, ‘আপনারা খেয়াল রাখবেন, ওরা পাঠ্যবইয়ের মধ্যে লুকিয়ে গল্প-উপন্যাস পড়ছে কিনা?’ এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় সব পরিবারেই সিলেবাস বর্হিভূত বই পড়া হয় সেভাবে, যেভাবে অমাবস্যায় সিঁধেল চোর সিঁধ কাটে। শত বছর পুরনো বাঙালি সমাজের একটা বিশ্বাস শুনে রাগ করবো, না উচ্চ স্বরে হাসবো— ভেবে পাচ্ছিলাম না। ঐ সময় সন্তানদের ব্যায়াম করতে দেওয়া হতো না। কারণ ব্যায়ামকে গুণ্ডামির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যায়াম না করে উপায় ছিল না। এখন জাতির সংস্কার হয়েছে— শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর পড়েছে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য বলে কিছু আছে—তা মানতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারাজ। কেউ মানলেও তা উন্নয়নের জোর চেষ্টা করেন না। আবার অনেকে বলে, ‘সবাই যদি বই পড়ে পণ্ডিত হয়ে লাইব্রেরিতে ঝিম ধরে বসে থাকে, তাহলে কলকারখানা গড়বে কে? বাণিজ্য করবে কে? দেশ চালাবে কে?’ প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্য বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন সফল পেশাজীবীর জীবনী পড়ে জানা যায়, একেকজন একেক পথ অবলম্বন করে সফল হয়েছেন। তবে প্রায় সবার মাঝে দুটো গুণ ছিল। এক. তাঁরা সময়ের সদ্ব্যবহার করেছেন। অর্থাত্ অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন; দুই. যে বই সামনে পেতেন পড়ে ফেলতেন। চীনের রাষ্ট্রনায়ক মাও সে তুং স্কুলের ছাত্রাবস্থায় স্থানীয় লাইব্রেরির প্রায় সব বই পড়ে ফেলেছিলেন। শুধু তিনি নন; মহাত্মা, ম্যান্ডেলা, লিংকন-নেহেরু-লেনিন, বিল ক্লিনটন-বিল গেটস—যাঁরা জগতের জন্য ভালো কিছু করেছেন, সবাই প্রচুর পড়তেন। অন্যদিকে, যাঁরা জগতে কলঙ্কের নজির; তাঁরা বইয়ের আশপাশে ভিড়তে চাইতেন না। ধরা হয়, যে একজনকে হত্যা করেছে, সে দুটি কবিতা মুখস্ত পাঠ করতে অসমর্থ। আর যে দুটি খুন করেছে, সে একটি কবিতা মুখস্ত পাঠ করতে পারবে না। কারণ সাহিত্য মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে তোলে। আত্মউপলব্ধিকে শাণিত করে। লাইব্রেরি কারাগারও বটে। এতে বন্দি আছে অতীতের জ্ঞান-চন্দ্র ও ভবিষ্যতের আধার-বিদারী রাঙা-রবি। সব লোকালয়ে কি লাইব্রেরি আছে? চাঁদা তুলে উপাসনালয় গড়া হয় সব জায়গায়; কিন্তু চাঁদা তুলে লাইব্রেরি গড়ার সংবাদ সচরাচর মেলে না। ক্ষণস্থায়ী আনন্দ উত্সবে মোটা টাকা দিতে ইচ্ছুক অনেকে; কিন্তু লাইব্রেরির কথা বললে বলে, ‘পরে যোগাযোগ করো।’ যে সুন্দর পৃথিবী প্রত্যাশা করছি, তা গড়ার দায়িত্ব কার? দায়িত্ব সবার। তাই সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচে গেছি। কারণ যা সবার দায়িত্ব তা কাউকে পালন করতে হয় না। কাউকে কৈফিয়তও দিতে হয় না। প্রত্যেকে একটি করে ফুলগাছ লাগালে জগত্ বাগানে রূপান্তরিত হবে। নোংরা করলে হবে ডাস্টবিন। আজকের পৃথিবী যদি মন্দ হয়—এ দোষ সবার। সুন্দর হলে তাও সবার গুণে। মন্দ কাজ ত্যাগ করতে না পারলেও—তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেশি ভালো কাজ করতে পারি। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন—...সাহিত্যের মধ্যে আমাদের জাত মানুষ হবে। সেইজন্যে আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে। ... আমাদের মনে হয় এ দেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল-কলেজের চাইতে একটু বেশি। অর্ধশতাধিক বছর আগে প্রমথ চৌধুরী লাইব্রেরি সম্পর্কে যা লিখেছেন তারপর লেখার আর কী বাকি থাকে? প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন আমাদের আত্মউপলব্ধি মনোবৃত্তি জাগানোর জন্য—আমরা পড়ি পরীক্ষার জন্য। এত লেখাতেই যখন ফল হয় না। বোঝা যায়, আদেশ-উপদেশে কাজ নেই —দরকার দৃষ্টান্তের। স্যাররা এতসব ছেড়ে যদি একটি লাইব্রেরি গড়তেন, দশটি গড়তেন ছাত্ররা। স্বপ্নদ্রষ্টার বড় অভাব, তাতে কী? আমরা ভবিষ্যত্ জগতে দৃষ্টান্ত হবো। জগতে বেশি সংখ্যায় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করবো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়