লাগামহীন বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি গার্মেন্টসসহ সব খাতের শ্রমিকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন-চার বছর পর মজুরি বাড়লেও এর সিংহভাগই বাড়িওয়ালাদের পকেটে চলে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ গার্মেন্টস অধ্যুষিত এলাকার শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ছোট একটি রুমের ভাড়া এক লাফে ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যাদের শিশু সন্তান রয়েছে সম্প্রতি তাদের কাছ থেকে আরো ২শ’ থেকে ৪শ’ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করা হচ্ছে। খরচ বাঁচাতে কয়েকজন শ্রমিক মিলে গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজধানীসহ শ্রমঘন শিল্প এলাকাগুলোতে এটাই এখন বাস্তবতা।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, বছরে দুই দফাও বাড়িভাড়া বাড়ানো হয়। গত জানুয়ারি থেকে বেশিরভাগ গার্মেন্টস শ্রমিক বর্ধিত মজুরি হাতে পেয়েছেন। এর আগেই পেয়েছেন বার্ধিত বাড়ি ভাড়ার নোটিস। বাড়ি ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা প্রসঙ্গে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও কথা বলেছেন। বিদ্যমান বাড়ি ভাড়া আইনটি কার্যকর করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছেন।
রাজধানীর তেজগাঁও, মালিবাগ, বাড্ডা, আদাবর, মিরপুর, ডেমরা, কামরাঙ্গিরচর, কেরানিগঞ্জ এলাকায় শ্রমিকদের বসবাস বেশি। এসব এলাকার পাশাপাশি সাভারের আশুলিয়া, বাইপাইল, জিরাবো, জামগড়া, জিরানি বাজার, টঙ্গী, গাজীপুর, কোণাবাড়ি, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস অধ্যুষিত এলাকার শ্রমিকরা বাড়িওয়ালাদের এ স্বেচ্ছচারিতার শিকার।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন ত্রিশোর্ধ শাহীনা আক্তার। কাছেই একটি আধাপাকা বাড়িতে ছোট এক রুমে গার্মেন্টস শ্রমিক ছোট বোন, বৃদ্ধা মা আর দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন এই গার্মেন্টস শ্রমিক। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর দুই বোনের আয়ে চলে পুরো সংসার। গ্যাস সুবিধা না থাকলেও আগে তিন হাজার টাকা ভাড়া গুণতে হতো। গত জানুয়ারিতে বাড়িওয়ালা আরো এক হাজার বাড়িয়ে চার হাজার টাকা ভাড়া দেয়ার জন্য নোটিস দেয়। তিনি বলেন, ‘বাড়িওয়ালা কয়, বেতন বেশি হইছে। ভাড়াও বেশি দিবা।’ দেন-দরবার করে দুইশ’ টাকা কমিয়ে এখন ৩ হাজার ৮শ’ টাকা ভাড়া দিয়ে ওই বাসায় থাকেন শাহীনারা।
মিরপুর এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্টস শ্রমিকরা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে কাছাকাছি এলাকায় থাকার সাহস পাচ্ছেন না। রুবিনা আক্তার নামে এক শ্রমিক কাজ করেন মিরপুর-১ এর একটি গার্মেন্টস কারখানায়। এই এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বেড়ি বাঁধের ওপারে তুরাগ পাড়ি দিয়ে কাউন্দিয়া (সাভারের একটি ইউনিয়ন) এলাকায় গিয়ে থাকেন। এতে তার কিছু টাকা বাঁচে। তবে এ জন্য প্রতিদিন তাকে প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে আসা-যাওয়া করতে হয়।
বাড়িভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছে ভাড়াটিয়া ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন। শিল্প এলাকায় লাগামহীনভাবে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ বিকালে সাভারের আশুলিয়া একালায় বিক্ষোভ সমাবেশ করবে সংগঠনটি। সংগঠনটির সভাপতি বাহারানে সুলতান জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনেরও সমন্বয়কারী। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বিদ্যমান ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন মানছেন না কোন বাড়ির মালিক। সাভার, গাজীপুরের মত শিল্প এলাকায় বছরে দুই বারও বাড়ি ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। ওইসব এলাকায় গ্যাস সুবিধা নেই এমন একটি বাড়ির ভাড়া ছিল দুই হাজার টাকা। কিন্তু গত জানুয়ারি থেকে এসব বাড়ির ভাড়া ক্ষেত্র বিশেষে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আবার যেসব শ্রমিকের শিশু সন্তান রয়েছে তাদের কাছ থেকে বাড়তি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। কোন বিকল্প না থাকায় শ্রমিকরা এসব মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যমান আইনে রয়েছে - কোন বাড়ির ট্যাক্সসহ অন্যান্য গ্যাস-বিদ্যুত্ বিল বাড়লে বর্ধিত হারে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যায়। বর্তমানে অধিকাংশ বাড়িতে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল ভাড়াটিয়াকে আলাদাভাবে দিতে হয়। এর বাইরে ট্যাক্সসহ অন্যান্য খরচ খুবই সামান্য হারে বাড়ে। সেই হিসেবে প্রতি বছর বাড়ি ভাড়া বাড়ার কথা নয়। কিন্তু বাড়িওয়ালারা এসবের তোয়াক্কা করেন না।
