অবশেষে অপহরণের চারদিন পর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ছয় জনের লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে। বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জের শান্তিনগর ও চর ধলেশ্বরী এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে গতকাল বিকালে লাশ উদ্ধার করা হয়। গত রবিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে নজরুলসহ ৫ জন এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারসহ দুইজনসহ ৭ জনকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড থেকে অপহরণ করা হয়। ছয় লাশ উদ্ধারের পর অপহূতদের মধ্যে নজরুলের গাড়ি চালক জাহাঙ্গীর হোসেনকে এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ছয় লাশ উদ্ধারের পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে নারায়ণগঞ্জবাসী। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়ক ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
লাশ ছয়টি এক কিলোমিটারের মধ্যে পায়ে ২৪টি করে ইট বোঝাই সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় নদীতে ডোবানো ছিল। পা ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধা। হাতও পিছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখমন্ডল পলিথিন দিয়ে গলার কাছে বাঁধা ছিল। পেট ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোজাসুজি ফাঁড়া ছিল।
বিকালে প্যানেল মেয়র নজরুলের ভাই আব্দুস সালাম ও স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি লাশ শনাক্ত করেন। এছাড়া নজরুলের সঙ্গেই অপহূত স্বপনের লাশ তার ছোট ভাই রিপন, তাজুল ইসলামের লাশ তার বোন শিরিন আক্তার শনাক্ত করেন। সেলিনা ইসলাম তার স্বামী নজরুলের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। নজরুলের সহযোগী লিটনের লাশ শনাক্ত করেন তার স্বজনরা।
সন্ধ্যার আগেই পুলিশ ছয় লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে লাশ পাঠায়। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে মর্গে আসেন আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ে সেজুতি সরকার। তিনি তার বাবার লাশ শনাক্ত করেন। মর্গের সামনে সেজুতি সরকার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সেখানে চন্দন সরকারের সহকর্মী কয়েকজন আইনজীবীও উপস্থিত ছিলেন। এর কিছু সময় পর চন্দন কুমার সরকারের গাড়ি চালক ইব্রাহিমের লাশ শনাক্ত করেন তার ভাগ্নে অমিতাভ। এর আগে দুপুর পৌনে ৩টার দিকে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া এলাকার শীতলক্ষ্যায় অজ্ঞাত পরিচয়ের অর্ধগলিত ৪টি লাশের সন্ধান পায় পুলিশ। পরে আরো ২ টি লাশ পাওয়া যায়।
বন্দর থানার ওসি জানান, স্থানীয় লোকজন তিনটি লাশ ভেসে ওঠার খবর পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ তিনটি উদ্ধার করে। লাশগুলো পচে গন্ধ বের হচ্ছিল। প্রতিটি লাশের হাত-পা বাঁধা ছিল। ২৪ টি করে ইট দিয়ে বাঁধার পর প্রত্যেকের পেট কেটে ভুঁড়ি গলিয়ে দেয়া হয়েছে। লাশগুলো সিমেন্টের খালি বস্তায় ভরা ছিল। বস্তা থেকে লাশ বের করার পর চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে একনজর দেখার জন্য শত শত মানুষের ভিড় হয়।
বন্দর থানার ওসি (তদন্ত) মোকারম হোসেন বলেন, ‘সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল এবং পেটে জখম ছিল, যা থেকে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসছিল। এটা দেখে বলা যায় যে, তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার।’
লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হন প্যানেল মেয়র নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ও তার ভাই আব্দুস সালাম। স্বামীর পরনে সাদা পাজামা এবং পাঞ্জাবি দেখে সহজেই স্ত্রী তাকে শনাক্ত করেন। এসময় তিনি চিত্কার করে ওঠেন। তিনি বলছিলেন, ‘একি সর্বনাশ হলো। কে আমার স্বামীকে খুন করলো।’ হত্যার বীভত্সতায় সেখানে উপস্থিত শত শত মানুষ স্তব্ধ হয়ে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শান্তিনগর এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত দুইদিন যাবত তারা এই লাশগুলি ভাসতে দেখেছেন। পুলিশি ঝামেলার ভয়ে তারা কাউকে এ বিষয়ে জানাননি।
মহাসড়ক অবরোধ
বিকালে লাশ উদ্ধারের সংবাদে নজরুলের সমর্থকরা ঢাকা-চট্রগ্রাম-সিলেট মহাসড়কের মৌচাক থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রদর্শনসহ অবরোধ করে রাখে। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে আছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন সমর্থকরা। সমগ্র সিদ্ধিরগঞ্জে বিরাজ করছে শোকের ছায়া।
গত রবিবার দুপুরে নজরুলসহ ১৫জন নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে নজরুলসহ ৫ জনকে এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারসহ দুইজন মোট ৭ জনকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড থেকে অপহরণ করা হয়।
নারায়ণগঞ্জে অব্যাহত খুন ও গুমের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জবাসী। এ ঘটনায় আইনজীবীরাও মাঠে নামেন। গত ৪দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সানারপাড় থেকে সাইনবোর্ড এলাকায় নজরুলের সমর্থক এবং আদালত চত্বরে আইনজীবীরা বিক্ষোভ করেন। মঙ্গলবার আইনজীবীরা ডিসি, এসপির কার্যালয় ঘেরাও করে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিলে মঙ্গলবার রাতে ডিসি,এসপি, র্যাব-১১ এর সিওসহ তিন র্যাব কর্মকর্তা এবং ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসিসহ ৭ জনকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
