আমাদের মাঝে অনেকেই শখ করে বাড়িতে পশুপাখি রাখেন। দেখা যায়, কেউ রাখেন বিভিন্ন ধরনের পাখি, কেউ রাখেন বিড়াল, কেউবা কুকুর, অবার অনেকের কাছে দেখা যায় খরগোশও আছে। এমন যদি হয় যে, কারও বাসায় গিয়ে দেখা গেল যে নরম তুলতুলে ছোট্ট একটা প্রাণী বসে আছে, যার নাম পান্ডা! তাহলে ব্যাপারটা বেশ মজারই হবে। কিন্তু এই শখটা খুবই দুর্লভ। পৃথিবীতে পান্ডার সংখ্যা খুবই কম। এই পান্ডাদের কথা লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
পৃথিবীময় যে বিভিন্ন প্রাণীরা দিনে দিনে বিলুপ্ত বা নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। তাদের সঙ্গে নাকি চীন দেশের এই পান্ডারাও যোগ দিয়েছে। বিজ্ঞানীরাই জানিয়েছেন একথা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আর মাত্র ২-৩ প্রজন্ম পরেই এই তুলতুলে, অসাধারণ কোমল সুন্দর প্রাণীটিকে পৃথিবীতে আর দেখা যাবে না। পান্ডাদের আবাস সেই সুদূর চীন দেশে। চীনের সিচুয়ান, সানজি আর গানসু প্রদেশের যে বড় বড় ফার গাছ আর বাঁশের বন আছে, সেখানেই এদের বসবাস। তাও আবার কি, এমন বনের সংখ্যা এখন মোটে ৬টি। প্রকৃতিতে হাজার খানেক আর চিড়িয়াখানা ও প্রজনন কেন্দ্র মিলিয়ে আরও ১৫০টির মতো। এই হচ্ছে বর্তমানের পান্ডার সংখ্যা। অথচ পান্ডারা যখন পৃথিবীতে আসে (২-৩ মিলিয়ন বছর আগে), তখন এদেরকে ভিয়েতনাম এমনকি পাশের দেশ মায়ানমারেও পাওয়া যেত। বেইজিংয়েও এদের একটা বড় বসতি ছিল। আর এখন কমতে কমতে মাত্র ৩টা প্রদেশে এসে ঠেকেছে এদের বসতি। এমনিতে চেহারায় প্রায় একটা মিষ্টি ভালুকের মতোও দেখতে, সাদা-কালো মিলিয়ে গায়ের রঙ। হাতে, পায়ের থাবা, গায়ের লোম-সবকিছুই প্রায় ভালুকের মতোই। কান-চোখে-পায়ে আর ঘাড়ে কালো লোমের আবরণ থাকে এদের আর দেহের বাকি অংশে থাকে সাদা লোমের আবরণ। পৃথিবীতে এদের সংখ্যা খুব কম হলেও পান্ডা কিন্তু খুব পরিচিত প্রাণী। এমনিতে খুবই শান্ত-শিষ্ট। কিন্তু যদি একবার ক্ষেপে যায়, তাহলে কিন্তু পান্ডাও একটা ভালুকের মতোই রেগে গিয়ে আক্রমণ করতে পারে। খানিকটা নাদুস-নুদুস, শান্ত-শিষ্ট বাচ্চা ছেলেপুলেদের মতো আর কী!
লম্বায় অবশ্য এই পান্ডারা কিন্তু খুব বেশি বড় হয় না। দেড় মিটারের মতো (৪-৫ ফুট) লম্বা আর ওজনে প্রায় ৭৫ থেকে ১৩৫ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর বনে বসবাসকারী পান্ডারা ১৮ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। চিড়িয়াখানায় থাকলে বেঁচে থাকতে পারে ৩৫ বছরের মতো। এদের মুখের চোয়াল হয় অনেক বড়। তা দিয়ে এরা লতা-পাতা আর এদের প্রধান খাবার বাঁশ চিবিয়ে খাওয়া। মানুষের মতোই দুই পায়ে হাঁটতে পারে এরা, আবার গাছেও চড়তে পারে দারুণ! মোটামুটি ৯৯ ভাগ পান্ডার প্রধান খাবার হলো বাঁশ। তবে ফুল, লতা, পাতা আর মাশরুমও নাকি কেউ কেউ খেয়ে থাকে। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটা পান্ডা প্রায় ১৬ ঘণ্টাই খাওয়ার পেছনে ব্যয় করে! অবশ্য খাওয়ার পেছনে সময়টা ওদের দিতেই হবে, কারণ পান্ডা যা খায়, তার মাত্র ২০ ভাগ হজম করতে পারে। খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে পান্ডা ঘুমিয়েও ওর ‘এনার্জি সেভ’ করে! প্রতিটা পান্ডার শরীরে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ! আর এই গন্ধের ভিত্তিতেই ওরা পরস্পরকে চিনে নেয়। ওদের তো আর আমাদের মতো নাম নেই কিংবা আলাদা আলাদা দেখতেও নয় কেউ। তাই শরীরের গন্ধই ভরসা। তবে ওরা যে মুখ দিয়ে শব্দ করে না, ব্যাপারটা তেমন নয় কিন্তু। মোটামুটি ১১ রকমভাবে ওরা ডাকাডাকি করে। কিন্তু কী যে বলে, এটা অবশ্য বিজ্ঞানীরা এখনও বের করতে পারেননি।
পান্ডারা বছরে একবারই বাচ্চা দেয়। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বাচ্চা পান্ডারা মা পান্ডা থেকে জন্মগ্রহণ করে। একসঙ্গে দুটো করে বাচ্চা জন্ম নেয়। আর জন্মের সময় এই বাচ্চাগুলোর ওজন থাকে মাত্র ৯০ থেকে ১৩০ গ্রাম! এই মুহূর্তে পান্ডারা পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতির মধ্যে ২য় অবস্থানে আছে। দেড় হাজার পান্ডার হদিসও হয়তো এখন আর পাওয়া যাবে না। আসলে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, ঘরবাড়ি তৈরির জন্য বন কেটে ফেলা, পান্ডাদের খাবার বাঁশ ঝাড়ের বাঁশ নিজেদের কাজে লাগানো, এগুলো মিলেই পান্ডাদের অবস্থা ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
