রংতুলির মানুষ

আপডেট : ০২ মে ২০১৪, ১৯:১৪
সফল মানুষ—হাজার মানুষের মধ্যে বিশেষ মানুষ। সফল লোকেরা সাধারণের চেয়ে এমন কিছু ভিন্নতা অর্জন করে যার ফলে তারা সফল হয়ে ওঠেন। তাদের এই সফলতার পেছনে যে শুধু বিশেষ মেধা বা প্রতিভাই মূল কারণ তা কিন্তু নয়, এই গুণের সাথে যুক্ত থাকে প্রচেষ্টা, পরিশ্রম, আত্মনিয়োগ। তাদের এই সফলতার গল্পগুলো আমাদের জীবনেও ফেলতে পারে ইতিবাচক প্রভাব। তাই এই সফল ব্যক্তিদের সফলতার নানা গল্প নিয়ে আমাদের এই নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যারা’। আমাদের এবারের সফল ব্যক্তিত্ব চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। তার ছেলেবেলা কেটেছে শৈল্পিক আবহে। বাবা গোলাম মুস্তাফা সাহিত্যিক, মেজো ভাই মুস্তাফিজ আজিজ চিত্রশিল্পী। মূলত এদের অনুপ্রেরণায় তার আঁকাআঁকির জগতে আসা। ১৯৩৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তার জন্ম। মাত্র ৫ বছর বয়সেই মাকে হারান। তখন তিনি খুব ছোট, একদিন বাবার স্কুলের মাঠে একটি ছেলে ‘সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো ডুবিলো বেলা, নদী কূলে বসে আছি একেলা’ এই গানটি গাইছিল, পাশে তার মেজো ভাই বসে ছবি আঁকছিলেন আশপাশেরর অনেকেই সেখানে ভিড় জমিয়েছেন। ছবি আঁকা শেষ হতে সবাই খুব জোরে হাততালি দেয়। বিষয়টি তাকে খুব বেশি অনুপ্রেরণা দেয়। সেই থেকেই আঁকাআঁকি শুরু। বাবার কর্মস্থল ছিল কলকাতায়। তার স্কুলজীবনও কেটেছে সেখানে। প্রথম ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। নারায়ণগঞ্জ থেকে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে স্কটিশ কলেজ চার্চে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। গণিতে খুবই দুর্বল ছিলেন, কেননা গণিতের খাতা ভরে শুধুই ছবি আঁকতেন। একদিন মুজতবা আলী তার ছবি দেখে বলেন, ‘িএত সুন্দর ছবি আঁকো, সায়েন্সের মতো কঠিন বিষয় নিয়ে পড়লে তো সৃজনশীলতা নষ্ট করে ফেলবে।’ তিনিই মুস্তাফা মনোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা আর্ট কলেজে গেলেন। শিল্পী রমেন চক্রবর্তী তার আঁকা দেখে খুশি হয়ে তাকে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। ১৯৫৯ সালে কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। যখন আর্ট কলেজে পড়তে শুরু করেন, তখন নতুন করে আবার সংগীত শিক্ষার সূচনা করেন ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য ওস্তাদ সন্তোস রায়ের কাছে। আর্ট কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় ‘হিজ মাস্টার ভয়েজ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সাথে একক সংগীত পরিবেশনার জন্য বশীর আহমেদ ও সুবীর সেনের সাথে যুগ্মভাবে সেরা গায়ক নির্বাচিত হন। তারপর প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থেকে গান করেছেন। তবে পরে আর্টের সাথে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় আর গান করা হয়নি। মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনের প্রথম প্রদর্শনীর পেছনেও রয়েছে একটি মজার ঘটনা। বাবার সাথে তিনি একটি চিত্র প্রদর্শনীতে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে কাগজে ছবি এঁকে বাইরের দড়িতে সেই কাগজ ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন তারপর রাস্তার সব লোক তার ছবি দেখেছে। আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেছিলেন। কলকাতার আর্ট কলেজ থেকে পাস করে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে ঢুকে প্রথম পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন। প্রথমবার তিনি ফোক পাপেট দলসহ ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দে সফর করেন। সেখানে তার দল প্রচুর প্রশংসা পান। ১৯৬০-৬১ খ্রিস্টাব্দের দিকে কলিম শরাফী তার ডকুমেন্টে প্রথম তার পাপেট অন্তর্ভুক্ত করেন। মুস্তাফা মনোয়ার তার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। এরপর একে একে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, বিটিভি ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ অসংখ্যা বার পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০০৭ সালেও ললিত কলা একাডেমি থেকে ‘গীতাঞ্জলি’ সম্মাননা পদক পেয়েছেন। মূলত সংস্কৃতির নতুন প্রজন্মের জন্য বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সাংস্কৃতিক পরিবারের ছেলে বলেই যে সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে গিয়েছি বিষয়টি আসলে তা নয়। আমি আমার বাবা, ভাইয়ের কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাদেরকে করতে দেখে আমারও কিছু একটা করার ইচ্ছা হয়েছে। আমি করেছি এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে সমর্থ হয়েছি অনেক পরিশ্রমের ফলে। আমার কাছে সফলতার মানে হচ্ছে মন থেকে চাওয়া, মন থেকে চেষ্টা করা, সবশেষে লক্ষ্যে পৌঁছানো। সুতরাং তোমরা যদি চাও, তাহলে পাবে এবং পেলে আরও চেষ্টা করতে হবে, তবেই মিলবে সাফল্যের সিঁড়ি।’