অনেকের আঁকাআঁকিতে ঝোঁক বেশি! ক্রিয়েটিভ কিছু করতে মন চায়, সময় পেলেই কম্পিউটারের পেইন্ট টুলস, ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর নিয়ে গাছ, পাখি, ফুল, ফল, বাড়ির দৃশ্য বা কারো নাম বা ছবি নিয়ে কাজ শুরু করে দেন। মূলত এভাবেই গ্রাফিক ডিজাইনের শুরু হয়। গ্রাফিক ডিজাইন হচ্ছে আর্ট বা কলার একটি মাধ্যম। চাহিদানুযায়ী বেশ কিছু কালার, টাইপফেস, ইমেজ এবং অ্যানিমেশন ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে যিনি সক্ষম হন তিনিই মূলত গ্রাফিক ডিজাইনার। এটার আউটপুট ডিজিটাল বা প্রিন্ট উভয়ই হতে পারে। পেশা হিসেবে গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের প্রতি এ প্রজন্মের বেশ আগ্রহ রয়েছে। তাই এ প্রজন্মের মেধাবী কয়েকজন গ্রাফিক ডিজাইনারদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।
গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
ইবরাহীম পারভেজ
গ্রাফিক ডিজাইনার (অ্যানিমেশন)
বাংলাভিশন
‘আইটির বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে অন্যতম একটি জনপ্রিয় সেক্টর গ্রাফিক ডিজাইনিং। এর জন্য প্রয়োজন নেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশাল কোনো ডিগ্রি অথবা একঝাঁক সার্টিফিকেটের। প্রয়োজন সৃজনশীলতা-বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়, সাথে ধৈর্য-সাধনা-চেষ্টা এবং চিন্তাশক্তি। বর্তমান সময়ে উচ্চ আয় আর সম্মান, সেই সাথে সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ থাকার কারণে দিন দিন বাড়ছে গ্রাফিক ডিজাইনারের সংখ্যা। গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়টি যেমন সহজ, তেমনি আনন্দদায়কও বটে’, বলছিলেন বাংলাভিশনের গ্রাফিক ডিজাইনার ইবরাহীম পারভেজ।
ইবরাহীম পারভেজ বলেন, ‘গ্রাফিক ডিজাইন সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজেই আমাদের দেশে ডিজাইনারদের কাজের সুযোগ রয়েছে। গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই ডিজাইন সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। তাই প্রযুক্তির উত্কর্ষের সাথে সাথে নিজেকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞাপন শিল্প থেকে শুরু করে প্রিন্টিং শিল্পের সব ধরনের কাজেই গ্রাফিক ডিজাইনের যথেষ্ট কাজ হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গ্রাফিক ডিজাইন আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের দেশেই শুধু নয়, এখন সারাবিশ্বেই ক্রিয়েটিভ বা গ্রাফিক ডিজাইন সেক্টরে জব মার্কেট অনেক ভালো। এ পেশায় সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। জব মার্কেট উন্নত হওয়ার পাশাপাশি আমাদের এখানে শিক্ষার মান অবশ্যই বেড়েছে। বিভিন্ন জায়গাতে এখন এ ধরনের অনেক কোর্স হচ্ছে। এই কোর্সগুলোও কিন্তু সফল হতে সাহায্য করবে আপনাকে।’
ইবরাহীমের ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকাতেই, এখানেই স্কুল-কলেজের পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বেশ কিছু কোর্স করে বন্ধুরা মিলেই শুরু করেন গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ। এরপর অ্যানিমেশনের কাজে হাত পাকান। চ্যানেল ওয়ান, এরপর বাংলাভিশনের মাধ্যমে এই জগতের বাসিন্দা হয়ে আছেন তিনি। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মাঝে তিনি দ্বিতীয়। স্বপ্ন দেখেন আমাদের গ্রাফিক ডিজাইন একদিন বিশ্বময় খ্যাতি কুড়াবে।
ইবরাহীম পারভেজ
ডাকনাম :পারভেজ
জন্মতারিখ ও স্থান :১২ ডিসেম্বর, কিশোরগঞ্জ
মায়ের নাম :নাহার বেগম
বাবার নাম :মো. সিরাজ উদ্দিন
প্রথম স্কুল :মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার মা
প্রিয় উক্তি :সদা সত্য কথা বলিবে।
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, আড্ডা দিয়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :বিষয়টা অনিশ্চিত, চেষ্টা করে যেতে হবে।
০০০০০০০০০০০০০০
রাজ্জাকুল হায়দার কানন
গ্রাফিক ডিজাইনার, বিটপি
সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন। নতুন নতুন পেশার উদ্ভব হচ্ছে। সেখানে আপনি আপনার মেধা ও মননশীলতার উত্কর্ষ দেখাতে পারেন। এভাবেই আপনি হয়ে উঠতে পারেন একজন সফল মানুষ। কর্মজীবনটা হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের। আপনি আপনার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনকে সাজিয়ে তুলতে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে পারেন অফুরান সম্ভাবনাময় পেশা গ্রাফিক ডিজাইনিং। আত্মবিশ্বাস ও নান্দনিক শিল্পবোধসমৃদ্ধ যে কেউ এ পেশার মাধ্যমে নিজেকে সাফল্যের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে পারেন। এই মাধ্যমে তেমনি একজন সফল মানুষ রাজ্জাকুল হায়দার কানন, তিনি কর্মরত রয়েছেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে।
উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় তোপখানা রোড়স্থ, লেজার স্ক্যান লি.-এ গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শিখা শুরু করেন কানন। প্রথম প্রায় ৩ মাস মাথায় কিছুই ঢুকত না, এক পর্যায়ে অনেকটা নিরাশ হলেন, মনে হলো তাকে দিয়ে এই কাজ আর হবে না। বাসা থেকে বের হতেন ঠিকই কাজ শিখার জন্য, কিন্তু বাইরে আড্ডা দিতেন। গ্রাফিক ডিজাইনের পথে কাননের শুরুর গল্পটা এমনই। পরিশেষে অনেক চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে কানন পৌঁছে যান অ্যাডভার্টাইজিং প্রতিষ্ঠান বিটপিতে। বর্তমানে এখানে প্রধান গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত আছেন। এই পেশাটি সম্পর্কে কানন বলেন, ‘এখন ডিজিটাল মিডিয়ার যুগ বা বিশ্ব, যার চালক হলো অতীতের চারুশিল্পী আর বর্তমানে গ্রাফিক ডিজাইনার। নতুনদের উদ্দেশে মেধাবী এই গ্রাফিক ডিজাইনার বলেন, ‘গ্রাফিক ডিজাইনকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক হলো কাজের অর্থাত্ পেশার স্থায়িত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায়।’ কানন মনে করেন, গ্রাফিক ডিজাইন একটি ধৈর্যের কাজ, মোটেও তা বিরক্তিকর নয়।
সবশেষে কাননের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন গ্রাফিক ডিজাইনকে ঘিরেই। এখানেই নিজেকে আরও বেশি সৃজনশীল করে গড়ে তোলার চেষ্টা তার অবিরত।
মো. রাজ্জাকুল হায়দার
ডাকনাম :কানন
জম্ম তারিখ :৫ আগস্ট
মায়ের নাম :নছুয়া বেগম
বাবার নাম :মো. আবুল খায়ের
প্রথম স্কুল :মনগাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মনগাজী, সোনাগাজী, ফেনী
প্রিয় মানুষ :বঙ্গবন্ধু (মা-বাবার পর)
প্রিয় উক্তি :সৃজনশীলতা এমন এক শক্তি যা মানুষের আচার-আচরণ বদলে দেয়।
প্রিয় পোশাক :যখন যেটা ভালো লাগে।
অবসর কাটে :আড্ডায়
সাফল্যের সংজ্ঞা :ভালোই সফলতা অর্জন।
০০০০০০০০০০০০
এমদাদুল হক সিকদার
সিনিয়র গ্রাফিক ডিজাইনার, বিকাশ লিমিটেড
তার শৈশব কেটেছে গ্রামে। গ্রামের নাম সোহাগপুর। বাড়ির পিছনেই ছিল ফসলের মাঠ। মাঠ পেরিয়েই মেঘনা নদী। তাই এখনও মাঝেমধ্যে বুকের ভিতর মেঘনার বয়ে যাওয়ার অনুভূতি পান, কানে বাজে জলের কলরব। এমদাদের শুরু গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা দিয়ে। প্রথম চাকরি একটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানে, ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাব্বির আহমেদ তার কর্মনিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দিয়ে এমদাদকে মুগ্ধ করেন, তিনিই তার কর্মজীবনে মডেল স্বরূপ। তারপর ৫ বছর কাজ করেন গ্রাফোসম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ে। অ্যাডভার্টাইজিং প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক লিমিটেডে কাজ করেন প্রায় ৬ বছর। বর্তমানে বিকাশ লিমিটেডে কাজ করছেন। এমদাদ বলছিলেন তার কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে, ‘প্রায় ১৭ বছরের কর্মজীবনে অনেক ধরনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিজেকে গর্বিতও মনে হয়। কিন্তু গ্রাফিক ডিজাইনের কাজটি সবটাই একটা টিমওয়ার্ক, তাই কোনো কাজকেই নিজের একার সাফল্য বলতে পারছি না। অ্যাডভার্টাইজিং প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক লিমেটেডে কাজ করে রবি, পিত্জা হাট, কেএফসি, নোকিয়া সিমেন্স, এ্যাপোলো হসপিটালের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর এখন বিকাশ লিমিটেডে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করছি।’ এমদাদুল হক মনে করেন, পেশা হিসেবে গ্রাফিক ডিজাইনিং আমাদের দেশে খুবই সম্ভাবনাময় একটি সেক্টর। একসময় ডিটিপি হাউজ, প্রিন্টিং প্রেস, অ্যাডফার্মগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল গ্রাফিক ডিজাইনের চাকরির সুযোগ। বর্তমানে বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজগুলোতেও গ্রাফিক ডিজাইনে চাকরির সুযোগ হচ্ছে। ‘এই পেশা নতুনদের জন্যই’ উল্লেখ করে এমদাদ বলেন, ‘নতুনরা তো সবসময় ভালো কাজ করবেই। নতুন প্রজন্ম মানেই তো নতুন কিছু, গ্রাফিক ডিজাইনের জন্য সবসময়ই চাই নতুন কিছু। নতুন আইডিয়া, নতুন পরিকল্পনা, নতুন সাফল্য।’ তিন ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে এই শহরে তার আপন নিবাস। এরই মাঝে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে নতুন দিনের পথচলার।
এমদাদুল হক সিকদার
ডাকনাম :এমদাদ
জন্ম তারিখ ও স্থান :১৫ নভেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানা
মায়ের নাম :রহমতার
বাবার নাম :দেওয়ান আলী সিকদার
প্রথম স্কুল :সোহাগপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :মানুষের ক্ষতি করে না এমন সব মানুষই আমার প্রিয়।
প্রিয় উক্তি :প্রত্যেকটি কাজই একেকটি শিল্প।
প্রিয় পোশাক :জিন্স ও পাঞ্জাবি
সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্যের কোনো সংজ্ঞা নেই, সাফল্যের পরেই সংজ্ঞার সৃষ্টি হয়।
