সৃষ্টিশীল স্থাপত্যে অনন্য

আপডেট : ০৪ মে ২০১৪, ২০:২২
তিনি ছোটবেলায় ছিলেন সাহিত্যের পোকা। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাতেও দেখিয়েছেন কৃতিত্ব। বুয়েটে পড়াশোনা করে এখন তিনি সৃষ্টিশীল নানা ধরনের স্থাপত্য তৈরির কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। ইতোমধ্যে তার স্থাপত্যকর্ম নানা মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। তিনি সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান স্থপতি রাজন দাস। তাকে নিয়ে লিখেছেন আহসান রনি তার ছোটবেলা কেটেছে সিলেটে, রামের দিঘির পাড়ে। তারা চার বোন এক ভাই। বাবা-মা এখনও সবার উপরে ছায়ার মতো আছেন। ছোট থেকেই বাবা-মায়ের সাহায্য পেয়ে এসেছেন। এখনও পাচ্ছেন। পড়াশোনাতে তার বরাবরই খুব আগ্রহ ছিল। কিন্তু সেই আগ্রহের বেশিরভাগ ছিল পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বই। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, সত্যজিত্, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ, নীহাররঞ্জন, সেবা প্রকাশনীর কিশোর ক্লাসিক, অনুবাদ, করবেটের শিকার কাহিনী আর সুকুমার, সুনির্মল বসু, যোগীন্দ্রনাথ, ভবানীপ্রসাদ, আল মাহমুদের ছড়া পড়ার পোকা ছিলেন তিনি। সাহিত্য পড়লেও একাডেমিক পড়াশোনায় অবহেলা করেননি তিনি। তাই তো এখন তিনি স্থাপত্যবিদ। সিলেট সরকারি পাইলট বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর স্নাতক সম্পন্ন করেছেন স্থাপত্যবিদ্যায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পড়াশোনাতে ভালোই ছিলেন। এসএসসিতে মেধাতালিকায় ছিলেন। পড়াশোনা শেষে ঢুকে গেলেন কাজের জগতে। এই পেশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন, ‘স্থাপত্যবিদ্যায় একবার যদি কেউ অনুপ্রবেশ করে, তবে তা ক্রমশ আগ্রহের স্তর থেকে চর্চাকারীকে নেশার স্তরে নিয়ে যায়।’ পাস করার পর থেকেই ছোট্ট পরিসরে ভালো মানের স্থাপত্য সৃষ্টির সুযোগ খুঁজছিলেন। ২০০৮-এ একটি ছোট কাজ জুটে যায়। ১০০০ বর্গফুটের রেস্তোরাঁ ‘উন্দাল’। নামটা একটা সিলেটি আঞ্চলিক শব্দ থেকে নেওয়া, যার মানে হলো ‘রান্নাঘর’। বড় প্রজেক্টের পেছনে ছোটেননি কখনও। সচরাচর বড় প্রজেক্টের ক্লায়েন্টের বৈষয়িক চাহিদা এতই বড় হয় যে, শিল্পের ঠাঁই করে নেওয়া সেখানে খুব কষ্টকর হয়ে উঠে। শিল্পীসত্তা সেখানে সম্ভ্রম রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে সমঝোতার পথে হাঁটা দেয়। গ্রাহকের মন যোগাতেই ব্যস্ত থাকে। তাই ছোট ছোট কাজে শিল্পীর স্বাধীনতা বেশি থাকে বলে তিনি মনে করেন। এটা আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা। ক্ষুদ্রের আকর্ষণেই এগিয়ে যাওয়া। সিলেটের জিন্দাবাজারে উন্দাল রেস্তোরাঁ, সিলেট ক্লাব লিমিটেড, কুটুমবাড়ি রেস্তোরাঁ, মদন মোহন কলেজ প্রাঙ্গণের শহীদ মিনার, সিলেট সরকারি কলেজের স্মৃতিসৌধ ‘আশ্রয়’, ডাক বাংলো মাঠের স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিসৌধ ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’, মুক্তিযুদ্ধকালীন ১১ নং সেক্টরের ১ নং সাব-সেক্টরের বধ্যভূমির উপর নির্মিত স্মৃতিসৌধ, বেশ ক’টি ডুপ্লেক্স ইটের বাড়িসহ অনেক ভালো ভালো স্থাপনা গড়েছেন নিজ হাতে। সিলেটের সুরমা পয়েন্টে নাগরী চত্বর, একটি শিরিষ গাছকে কেন্দ্র করে শহীদ মিনার, গাছ ও শহীদ মিনার মেলবন্ধন, গোলাপগঞ্জ, সিলেট শহরের এক কবির বাড়িসহ অনেকগুলো ভালো ভালো কাজের সাথে যুক্ত আছেন তিনি। করে চলেছেন নতুন নতুন সৃষ্টিকর্ম। ২০০৯ সালে আইসিই-টোডাট-অ্যাকুয়া পেইন্ট ইন্টেরিওর ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড ২০০৯-এ সেরা রেস্টুরেন্ট ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পান তিনি। সিলেটের মদন মোহন কলেজ প্রাঙ্গণে করা ভিন্ন আঙ্গিকের শহীদ মিনার বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শ্রীমঙ্গলে ‘কুটুমবাড়ি’ রেস্তোরাঁটি একুশে টিভির পর্যটন বিষয়ক অনুষ্ঠানে ঠাঁই পেয়েছে। তিনি নিজেকে সফল মনে করেন না। সফলতার সূত্র তিনি জানেন না। তবে সৃষ্টির আনন্দ পেতে চান। রবীন্দ্রনাথ ধার করে বললেন, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনা জালে, হে ছলনাময়ী’। কথা বললেন বর্তমান তরুণদের সম্পর্কে। তার মতে, তরুণরাই আগামী দিনের বাসগৃহের নব আঙ্গিক রচনা করবে। এটাই ভবিতব্য। যারা দেশ নিয়ে জাতি নিয়ে এর ইতিহাস নিয়ে ভাবে তাদের এই কাজে আগ্রহী হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। এদেশের স্থাপত্য কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘স্থাপত্য বিষয়ে আন্তর্জাতিক আর আঙ্গিকে দেশীয় হওয়াই জরুরি বলে মনে করি।’ মা-বাবা, বড়ভাই, বৌদি, স্ত্রী সুজয়া, সাড়ে ৪ বছরের ছেলে চিত্র—এই নিয়ে তার সংসার। পরিবারের কাছ থেকে সাহায্য ও উত্সাহ পান সবসময়। নিজের ছেলে-মেয়েকে ভবিষ্যতে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে তিনি জানালেন, তারা যেন তাদের মনের ইচ্ছাকে মূল্য দেয়। অর্থাত্ ইচ্ছাদেবীর পূজারী হয়। তাহলে সে আপনাতেই মানুষ ও প্রকৃতি সচেতন হয়ে উঠবে। আগামীতে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনাশ্রয় বা ঠাঁই কেমন হবে—তা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। তরুণ এই স্থাপত্যবিদ জগতের আনন্দযজ্ঞে অংশ নিতে চান আমৃত্যু।