সামগ্রিকভাবে সম্পদ সৃষ্টি, সঞ্চয় বাড়ানো এবং প্রবৃদ্ধিকে উত্সাহিত করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাজেটের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকতে হবে। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সুশাসন, জনপ্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থাকা হচ্ছে বাজেটের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পূর্বশর্ত। সুশাসন জোরদার করা না হলে অব্যাহতভাবে সম্পদ সৃষ্টি ও সম্পদের সুষম বন্টন সুনিশ্চিত করা যাবে না। লাগামহীনভাবে মুদ্রাস্ফীতির বৃদ্ধি রোধে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বাজেটে সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। আমাদের উন্নয়ন বাজেটে কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে উল্লেখিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি যাতে সময়মত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
রাজস্ব বাজেটেও সম্পদ সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। অর্থনীতিতে পাইকারি হারে ভর্তুকি প্রদানের রেওয়াজ অর্থনীতির জন্য শুভ নয়। যদি একান্তভাবে ভর্তুকি দিতেই হয়, তা কেবলমাত্র অপরিহার্য ব্যবসায়িক স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই দিতে হবে। লোভী, স্বার্থান্বেষী এবং সম্পদশালী এবং প্রভাবশালী মহল যাতে ভর্তুকির ফায়দা লুটতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অদক্ষদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম দেশ-বিদেশের প্রকৃত উদ্যোক্তাদেরকে যেন নিরুত্সাহিত করা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অদক্ষ উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও কর ফাঁকি দেয় এরূপ উত্পাদকদেরকে কর অবকাশ প্রদানের সুবিধা দেয়া সমর্থনযোগ্য নয়।
বিগত বছরগুলোতে বাজেটে কালো টাকাকে সাদা করার জন্য অর্থাত্ অবৈধভাবে অর্জিত টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ব্যবস্থা বহাল থাকলে বৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থ (যার কর পরিশোধিত হয় যথাযথভাবে) নিরুত্সাহিত হয় এবং দুর্নীতি প্রশ্রয় পায়। তাই বাজেটে এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত যাতে অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকার উত্স বন্ধ হয়ে যায়। করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা নিতে হবে। যৌথ মূলধনী কোম্পানী ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের পরিদপ্তরে (Registrar of Joint Stock Companies and Firms) ৬২ হাজার কোম্পানী বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে, অথচ মাত্র সাত কি আট হাজার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে বলে পত্রিকার খবরে জানা জায়। এসব কোম্পানীকে করের আওতায় নিয়ে আসলে করের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ থেকে আয় (বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ), আবাসন খাত, বাণিজ্যিক বা বৃহত্ কৃষি খাত প্রভৃতিকে করের আওতায় আনা যায় কিনা বিবেচনা করা দরকার। দেশের প্রায় ২৫ লাখ Beneficiary Owners (BO) হিসাবধারীদের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ করদাতার TIN নম্বর নেই বলে শুনা যায়। আবার অনেকের TIN নম্বর ভুয়া বলেও শুনা যায়। এ ব্যাপারে বাজেটে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
অনেক ব্যক্তি কর পরিশোধের ক্ষমতা রাখেন অথচ করের নিয়মকানুন সম্পর্কে ভাল জানেন না কিংবা হয়রানির ভয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন না। এ ধরনের ব্যক্তিকে কর প্রদানে অনুপ্রাণিত করতে হবে এবং তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আকার, আয়তন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, TIN এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য প্রযুক্তি বৃদ্ধির জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাস্তবসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের দিকটি বাজেটের মূল প্রক্রিয়ায় খুব একটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় না। স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়িয়ে এবং এর চারপাশে নিশ্ছিদ্র ব্যুহ তৈরী করে বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের পথ সুগম করা যায় বলে আমার ধারণা। এডিপি (ADP) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় এডিপি প্রণয়ন করা হয়। সময়মত এডিপি বাস্তবায়নের হারও তেমন সন্তোষজনক নয়। এডিপি’র যথাযথ ও সময়মত বাস্তবায়নের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের বাজেটের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্স হলো বিদেশে অবস্থানরত কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স। বিগত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ উত্সকে উত্সাহিত করার জন্য বিদেশে গমনেচ্ছুক শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং বিদেশে যাতে তারা ন্যায্য মজুরি পায় সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তাছাড়া তাদেরকে নতুন নতুন সুবিধা ও প্রণোদনা দিয়ে রেমিট্যান্স প্রেরণে উত্সাহিত করা প্রয়োজন। দেশের কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, প্রকৃত নিঃস্বদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালীকরণ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির যথাযথ ও কার্যকরী বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বাজেটে বিশেষ নজর দিতে হবে। পোশাক কারখানা ও শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। GSP সুবিধা বহালের জন্য ও পোশাক রপ্তানির নতুন উত্স সৃষ্টির জন্য কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদার করতে হবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য মূল প্রতিবন্ধক হচ্ছে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি স্বল্পতা। ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ার কারণে প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান, সড়ক নির্মাণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণ, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক যানজট নিরসন, উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা খাতকে গুরুত্ব প্রদান, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, তিস্তা পানি বন্টন সমস্যার সমাধান, পদ্মা সেতু নির্মাণ, দুর্নীতি দমন এবং স্বাস্থ্য ও সেবা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন শিল্প প্রসারের ফলে পাহাড় কাটা, বন নিধন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে দেশের জলবায়ু, তাপমাত্রা, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত বাণিজ্য খুবই অসম্ভব।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হিস্সা ও আওতা বাড়নোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। দেশের জনগণের আয় বৈষম্য হ্রাস ও ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততা থাকা প্রয়োজন যাতে জনগণ এ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলতে না পারে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী অভিধায় ভূষিত করা হলেও এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের জন্য কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উল্লেখ থাকা আজ সময়ের দাবি। আশা করি আগামী ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় ও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে।
লেখক:প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
