কর্পোরেট কর হ্রাসে বিনিয়োগ বাড়বে না
ষষ্ঠ-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অনুমানগুলো অবাস্তব এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে
জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসলেও অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসেনি। আস্থা ফেরেনি বিনিয়োগকারীদের। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে বলে উল্লেখ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে আসছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অনেকেই মনে করেছিলেন রাজনৈতিক অস্থিরতা কমলে অর্থনীতি গতিশীল হবে, কিন্তু তা হয়নি। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, রফতানির গতি ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হার কমেছে, রাজস্ব আদায়ও গত বছরের তুলনায় কমেছে। রেমিটেন্সে নিম্নগতি ও বৈদেশিক সাহায্যে পতন হয়েছে। সামগ্রিক ভাবে আমদানি বৃদ্ধি পেলেও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর থেমে থাকা উত্পাদন ক্ষমতা চালু হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগে আস্থাহীনতা কাটেনি। সম্পদের নিরাপত্তাহীনতার সাথে দেশে ব্যক্তি জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। যখন ব্যক্তি বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে তখন দেশের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সাথে সাথে সঞ্চয় হারও কমে যায়। অর্থ পাচারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি না হচ্ছে এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনীতির মৌলিক পরিবর্তন হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের ষষ্ঠ-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অনুমানগুলো অবাস্তব এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। রাজনৈতিক কারণে অবাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তাই সরকারের অর্জনগুলো নিচে নেমে গেছে। প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে ওঠা। দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠির পক্ষ থেকে কর্পোরেট কর কমানোর দাবি করা হলেও দেবপ্রিয় বলেন, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কর্পোরেট কর এখনও কম রয়েছে। দেশে বিনিয়োগ না হওয়ার জন্য কর্পোরেট কর নয়, অন্যান্য বিষয়সহ আস্থাহীনতাকে দায়ী করেন তিনি।
সম্মেলনে মূল প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন, সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সভাপতিত্ব করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। আসছে বাজেট প্রস্তাবনায় কর্পোরেট কর হ্রাসের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ড. ফাহমিদা উল্লেখ করেন, কর্পোরেট কর কমালে তা বিনিয়োগ বাড়াতে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে না। তিনি বলেন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্বপ্নেই রয়ে গেছে, বেশিরভাগ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন লক্ষ্য অনুযায়ী হয়নি। আসছে বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাড়তি ৬০০ কোটি টাকা দেয়ার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে চাপ বাড়বে। বিলম্বের ফলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সেই সাথে এই সেতুতে টোল হারও পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রফতানি খাতের উন্নয়নে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের আকার ১২০ কোটিতে উন্নতি করতে হবে। বাজেট প্রস্তাবনায় করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা করার পাশাপাশি করের আওতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে করযোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ানো, বাড়িওয়ালাদের ওপর কর আরোপ, সম্পদ কর আরোপ, কর অবকাশ প্রাপ্ত সুবিধা কমানো, পুঁজিবাজারে নেই এমন করমুক্ত প্রতিষ্ঠানের উপর বাড়তি ১০ শতাংশ প্যানেল কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়। সেই সাথে ভর্তুকির চাপ কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ বিভিন্নখাতে দেয়া প্রণোদনা সুবিধা পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়। সেইসাথে কুইক রেন্টালে দেয়া ভর্তুকি পুনর্বিবেচনা করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
