বাঙালির নির্বাচনী সংস্কৃতি ও সুসংহত গণতন্ত্র

আপডেট : ০৪ মে ২০১৪, ২২:০৬
গণতন্ত্রের মূলসুর হইল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দ্বারা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা। এই ব্যবস্থায় জনগণ তাহাদের পছন্দ ও ইচ্ছানুযায়ী ব্যক্তি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করিয়া থাকে। কিন্তু ভোট সংস্কৃতিতে, বিশেষত উপমহাদেশের নির্বাচনসমূহে মাঝেমধ্যেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইয়া প্রতিদ্বন্দ্বী দলসমূহের মধ্যে শক্তি প্রয়োগ করিয়া নির্বাচন জিতিয়া লইবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী পক্ষসমূহের আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং একপক্ষের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাইলে অপরপক্ষের দ্বারা এহেন হানাহানির সূত্রপাত ঘটিয়া থাকে। গত কয়েকটি নির্বাচনে বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রায় একইরকম সংঘর্ষের ঘটনা লক্ষ্য করা গিয়াছে। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, ভারতের চলতি নির্বাচনে সংঘর্ষ ও ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটিয়াছে বাংলা ভাষাভাষী এই অঞ্চলটিতে। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে দ্বিজাতিভিত্তিক ভারত বিভাগের ফলে বাংলা ভাষাভাষী জনগণ যথাক্রমে পশ্চিমবঙ্গ এবং বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে বিভক্ত হইয়া পড়ে। কিন্তু দেশ বিভাগ হইলেও, কতক বৈশিষ্ট্যে আমাদের মিল একরকম অবাক করিবার মত। সংস্কৃতি, ধ্যান-ধারণা এবং পোশাক-পরিচ্ছদে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রহিয়াছে উল্লেখযোগ্য মিল। সম্প্রতি বাংলাদেশে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে। সেই সুবাদে বিশ্ববাসী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের ভোট সংস্কৃতিতে বিশেষ ও অভিন্ন কিছু মিল খুঁজিয়া পাইয়াছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রীতিতে হানাহানি যেন নিত্য সঙ্গী। পশ্চিমবঙ্গে কয়েক মাসের পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে এই পর্যন্ত ৮৪১ টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৮ জনের প্রাণহানি এবং ৭৪০ জন মারাত্মকভাবে আহত হইয়াছে। ইহারপর ব্যালট ছিনতাই, পেশীশক্তির মহড়া ও হুমকি-ধামকির ঘটনাতো পত্রিকা খুলিলেই দেখিতে পাওয়া যায়। তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের ভয়ে ভীত হইয়া বীরভূম জেলার বোলপুরে কেহই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবার সাহস করেন নাই। যাহারা নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে চাহিয়াছিলেন অনুব্রত তাহাদের হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়াছেন। ইহাতে প্রশাসন ছিল নিশ্চুপ। তাহাছাড়া নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা শেষ হইবার আগে এই ব্যাপারে কোনও সুরাহার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখায় কেন্দ্র। আর বাংলাদেশে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হইলেও মাঝপথে, এমনকি নির্বাচনের দিন, নানা অভিযোগ তুলিয়া নির্বাচন বয়কট করিবার ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত আছে। দুই অঞ্চলের মধ্যে অসংখ্য মিল থাকা সত্ত্বেও একটি জায়গায় বিস্তর অমিল লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমবঙ্গে এতসব দুর্ঘটনা ঘটিয়া গেলেও ভারতীয় আইন-কানুন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির জোরালো ভূমিকার কারণে কেহই নিজেদের দোষ গণতন্ত্রের ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়া সামরিক শাসনে আগ্রহ দেখান নাই, যাহা এই বাংলাদেশে অহরহই পরিদৃষ্ট। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র এইখানে হয় অজ্ঞাতসারে না হয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে অস্বীকার করিয়া চলেন কেহ কেহ। ইহাকে বাংলা প্রবচন-মাথা ব্যথায় মাথা কাটিয়া ফেলিবার সহিত তুলনা করা চলে। মাথার অসুস্থতা না সারাইয়া সহজ সমাধান হিসাবে মস্তকচ্ছেদ করিবার কথা কেবল নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক। এই দেশের মানুষ সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হইয়া বিভিন্ন সময় যেইরকম ব্যাপক গণ-আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল তাহাতে সহজেই অনুমেয় সামরিক শাসন কেবল দীর্ঘমেয়াদি অশান্তিই ডাকিয়া আনে। অতি সাম্প্রতিককালে মিশরের ৬৮৩ জনের ফাঁসির আদেশতো কেবল সামরিক শাসকের দ্বারাই সম্ভব, গণতন্ত্রীপন্থি কাহারও পক্ষে এইরূপ হঠকারী সিদ্ধান্ত লওয়া একরকম অসম্ভব। বিশ্বব্যাপী এই পর্যন্ত যেই সকল গণহত্যা সংঘটিত হইয়াছে তাহার বেশিরভাগই ঘটিয়াছে সামরিক শাসকের আদেশেই। তাহাছাড়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যান্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মধ্যে আপতিত হইলেও সামরিক শাসকদের কিছুই করিবার থাকে না। ইহাতে দেশ হইয়া পড়ে জনবিচ্ছিন্ন এবং দারিদ্র্য স্থায়ীরূপে বাসা বাঁধিতে থাকে। কাজেই, আমাদের গণতন্ত্রে গত কয়েক দশকে যে ত্রুটি-বিচ্যুতির সৃষ্টি হইয়াছে তাহার সমাধান না করিয়া গণতন্ত্রকেই নির্বাসনে পাঠাইবার কথা যাহারা ভাবেন, তাহারা আত্মঘাতীমূলক কাজ করেন। ইহাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও আঘাতপ্রাপ্ত না হইয়া পারে না। তবে বিদ্যমান ত্রুটি সারাইয়া তুলিতে ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করিতে জনগণের চাহিতেও যে বেশি দায়িত্ব রহিয়াছে সরকার ও সকল রাজনৈতিক দলসমূহের, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।