নারায়ণগঞ্জে অপহরণ করে সাত জনকে হত্যার ঘটনায় সীমান্তে, নৌ, স্থল এবং বিমানবন্দরে রেড অ্যালার্ট (বিশেষ সতর্কাবস্থা) জারি করা হয়েছে। নির্দেশ দেয়া হয়েছে কোন ভাবেই যাতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা দেশ ত্যাগ করতে না পারে। এদিকে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও কয়েকটি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি নূর হোসেন ও দুই নম্বর আসামি ইয়াসিন মিয়া ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। যদিও হত্যাকাণ্ডের পরপরই তারা দেশ ছাড়েনি। মামলার বাকি আসামিদেরও কোন খোঁজ নেই, ধারণা করা হচ্ছে তারাও দেশে নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলেছেন, খুনিদের দেশত্যাগ করার পর রেড অ্যালার্ট জারি করাটা প্রহসন মাত্র।
২৭ এপ্রিল ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুলসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় লাশ পাওয়া যায় ৬ জনের। পর দিন আরেক জনের। এ সময় পর্যন্ত খুনিরা এলাকাতেই ঘুরে বেড়িয়েছে, কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে দেন-দরবারও করেছে। স্বজনহারারা ও এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কাঁচপুর ও সিমরাইল এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেনকেও এলাকায় দেখেছেন।
অপহরণের পরপরই কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং নজরুলের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যান ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে নূর হোসেন ও ইয়াসিনের নাম পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বলেছিলেন। যদিও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতারে তত্পরতা দেখায়নি। বলা চলে তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। আর এই সুযোগে জড়িতরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন সীমান্ত পথে দেশ ছাড়েন ১ মে। আর মামলার দুই নম্বর আসামি ইয়াসিন মিয়া শাহজালাল বিমানবন্দরের মাধ্যমে ২৮ এপ্রিল পালান।
এখন প্রশ্ন ওঠেছে, তাদেরকে পালিয়ে যেতে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহযোগিতা করেছে না তাদের গ্রেফতারে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ কাজ করছে। নজরুলের স্ত্রী ও সাত খুনের মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বলেন, নূর হোসেন নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারী। হত্যাকাণ্ডে মিশন চূড়ান্ত করতে কোটি কোটি টাকা নূর হোসেন ব্যয় করেছে। ৬ কোটি টাকা একটি সংস্থাকে দিয়েছে। সেই নূর হোসেন ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ইয়াসিন মিয়া গ্রেফতার হলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হত। এ কারণেই প্রধান দুই খুনিকে বিদেশে নিরাপদে পালিয়ে যেতে নেপথ্যে নায়করা সহযোগিতা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শহীদ চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, বিমানবন্দরে এত নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কি করে ইয়াসিন মিয়া সিঙ্গাপুর চলে গেল?
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যে ইয়াসিন মিয়া চলে গেছেন তা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষসহ একাধিক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এক নম্বর আসামি নূর হোসেন সীমান্ত পথে ১ মে সন্ধ্যার পর ভারতে চলে গেছে। এ বিষয়টি একাধিক অনুসন্ধানকারী কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
হত্যা মামলার অন্য আসামি ঠিকাদার হাসমত আলী হাসু, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রাজু, নূর হোসেনের ক্যাডার বাহিনীর সদস্য আনোয়ার হোসেন আসিফ, ৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল এবং তিনি নূর হোসেনের ভাতিজা ও বিএনপি কর্মী ইকবাল হোসেনের কোন হদিস নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বাকি আসামিরাও মনে হয় দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।
চাঁদা তোলাই ছিল নূর হোসেনের
ব্যবসা:
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, বালুর ব্যবসা, পরিবহনে চাঁদাবাজি সবকিছুই ছিল নূর হোসেনের নিয়ন্ত্রণে। সেভেন সেভেন নামে এখানে একটি ইটের ভাটা থেকে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা নেন। সিদ্ধিরগঞ্জের ওভারব্রিজের ঠিকাদার মাসুমের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা, সুলতান নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩৮ লাখ টাকা, আমির ভান্ডারি নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে নেন ৬০ লাখ টাকা। এগুলো এখন নারায়ণগঞ্জের মানুষের মুখে মুখে। নারায়ণগঞ্জে চুনের ফ্যাক্টরি রয়েছে ২২টি। এসব ফ্যাক্টরি থেকে প্রতিমাসে ২ লাখ টাকা এবং শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে ৫০/৬০টি পাথরের বালির টেক থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে নিতেন নূর হোসেন।
১৯৮৬ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় ইকবাল গ্রুপের ট্রাকের হেলপার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন নূর হোসেন। পরে ড্রাইভিং শিখে একই গ্রুপে চাকরি নেন। ১৯৮৮ সালের দিকে শিমরাইলে আন্তঃজেলা ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম চালু করেন দাইমুদ্দিন নামের এক ট্রাক ড্রাইভার। তার হাত ধরেই নূর হোসেন হেলপার হিসাবে যোগ দিয়েছিল ইকবাল গ্রুপে। ১৯৮৯ সালের দিকে দাইমুদ্দিনকে বের করে দিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের দখল নেন নূর হোসেন। ১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রার্থী হিসাবে পরবর্তী ইউপি নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন নূর হোসেন। নির্বাচিত হয়ে পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন নূর হোসেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় তার পরিচয় হয় হোসেন চেয়ারম্যান হিসাবে। ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে এলাকার স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, রাস্তায় ইট বিছানোর নামে পরিষদের তহবিল তসরুফ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঠানো অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী আত্মসাত্সহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়ার অভিজ্ঞতা হলো তিনি নূর হোসেনের অপকর্ম দেখভাল করেন। এ থেকে দৈনিক তাকে নূর হোসেন ভাতা দেন। সমপ্রতি ইয়াসিন মিয়ার স্ত্রীর সিঙ্গাপুরে চিকিত্সার জন্য ২৫ লাখ টাকা নূর হোসেন দিয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। হাসমত আলী হাসু নূর হোসেনের ঠিকাদারী পার্টনার। স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা রাজু চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে পটু। ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাদল ব্যবসায়ী হাবিব হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। বিএনপির কর্মী ইকবাল নূর হোসেনের ক্যাডার। চার দলীয় জোট সরকারের আমলে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও তার প্রধান খুনি নূর হোসেন ৫ বছর ভারতে পলাতক ছিলেন। তারা একসঙ্গে ভারতে থাকতেন। নূর হোসেনের ভারতে নিজস্ব এপার্টমেন্ট রয়েছে বলে একটি সংস্থাসূত্রে জানা যায়।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, নূর হোসেন ও ইয়াসিন বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কোন সংবাদ তাদের কাছে নেই। গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
র্যাবের মহাপরিচালক মো. মোখলেসুর রহমান জানান, মামলার আসামিদের বিদেশ যাওয়া সম্পর্কে তার কাছে কোন তথ্য নেই।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার জানান, সারাদেশে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দুই আসামি বিদেশে পালিয়ে গেছেন কিনা এমন কোন তথ্য তার কাছে নেই।
বেনাপোল চেকপোস্টে রেড এলার্ট
বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা জানান, বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে যাতে নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের কোন এজাহারভুক্ত আসামি বা সহযোগী ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে সে ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ফলে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনে অতিরিক্ত সতর্কতার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। বেনাপোল চেকপোস্টে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।
ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের পাশাপাশি সীমান্তের অবৈধপথে যাতে এসব আসামি ও সহযোগীরা পালিয়ে যেতে না পারে এ জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন যশোর ২৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে.কর্নেল মতিউর রহমান।
বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট পুলিশ ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের আসামিসহ ওই এলাকার সন্ত্রাসীদের তালিকা হাতে পাওয়ার পরপরই গোটা ইমিগ্রেশন এলাকায় ব্যাপক সতর্কতা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি পাসপোর্টযাত্রীর চেহারার সাথে ছবি মিলিয়ে যাত্রীকে ভারত গমনের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ইমিগ্রেশন ছাড়াও নো-ম্যান্সল্যান্ড ও আশপাশে সতর্ক আছে পুলিশ।
সীমান্তের শার্শা ও পোর্ট থানা পুলিশও সতর্ক আছে বলে জানান পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অপূর্ব হাসান।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল
বন্দরে জরুরি সতর্কতা
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় জড়িতরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারে সেজন্য ভোমরা স্থল বন্দরে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ভোমরা ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসআই) শহীদ এ ঘটনা নিশ্চিত করে বলেন, নারায়ণগঞ্জ সেভেন মার্ডারের মোস্ট ওয়ান্টেড নূর হোসেনসহ সাতজন যাতে কোনোভাবেই ভারতে যেতে না পারে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা নিতে তাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
