সোনারগাঁওয়ের রসালো লিচু বাজারে

আপডেট : ০৫ মে ২০১৪, ২২:৫৪
সোনারগাঁওয়ের অধিকাংশ লিচুগাছেই ঝোপায় ঝোপায় লাল-সবুজ আর হলুদ রঙ ধারণ করেছে। মধ্যযুগের বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজধানী সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকার বাগানে রসালো মৌসুমী ফল লিচু পেকেছে। এবছর কড়া রোদ তাপদাহ ও সময়মত বৃষ্টি না হওয়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় লিচুর ফলন একটু কম। গাবতলী সাধুরবাগসহ বেশকিছু বাগানে রয়েছে লিচু। এবছর ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে গাছের অধিকাংশ লিচু নষ্ট হয়েছে। বাগান মালিকরা জানান, ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার পর যে পরিমাণ লিচু বাগানের গাছগুলোতে রয়েছে তা অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা কম। সোনারগাঁওয়ের লিচু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আগে বাজারে আসে বলে এ লিচুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ও বিক্রেতার চাহিদা একটু বেশিই থাকে। তবে সোনারগাঁওয়ের গাবতলী সাধুরবাগের লিচুর চাহিদা অন্যান্য বাগানের লিচুর চেয়ে বেশি। কারণ এ লিচু আকারে বড় ও সুস্বাদু। সোনারগাঁওয়ে কিছু লিচুবাগান ঘুরে দেখা গেছে, বাগানের প্রায় প্রতিটি লিচুগাছেই ঝোপায় ঝোপায় লাল-সবুজ আর হলুদ রঙ রূপ ধারণ করে কাঁচা-পাকা লিচু ঝুলছে। সবুজ গাছের ডালে ডালে ঝুলন্ত টকটকে রংয়ের রসালো ফলের গুচ্ছলিচুর দৃশ্য খুবই চমত্কার। বাগানের প্রতিটি গাছে বৈদ্যুতিক বাতি, বাঁশ টিনের বাজনা বাজিয়ে উচ্চশব্দ করে বাদুড় ও কাকের উপদ্রব থেকে লিচু রক্ষা করতে দিন-রাত পাহারা চলছে। রাতে পাহারা দেয়ার সময় প্রতিটি বাগানে উত্সবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে লিচু ছিঁড়ে ৫০টি করে ঝোপ বেঁধে বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। সোনারগাঁও উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় তিন শতাধিক লিচুবাগান। কিছু কিছু লিচুবাগানে গত ২-৩ বছরের তুলনায় এবছর বাম্পার ফলন হয়েছে। রোদের তাপ ও সময়মত বৃষ্টি না হলেও লিচুর মুকুল খুব একটা ঝরেনি, তাই এবছর আশানুরূপ ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঐসব লিচুবাগানের মালিকরা। মৌসুম শুরুতে সোনারগাঁওয়ে লিচুর দাম একটু চড়া থাকে। সোনারগাঁওয়ের লিচু বাগানগুলোতে সাধারণত ছয় জাতের লিচুর ফলন হয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে সোনারগাঁওয়ের কদমী, বোম্বাই, চায়না-৩, মোজাফফরপুরী, এলাচি, বাদামী বা পাতি। অন্যান্য লিচুর চেয়ে কদমী লিচু চাষের প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়ছেন চাষিরা। এ ছয় প্রজাতির লিচুর মধ্যে সবার আগে পাকে বাদামী (পাতি) লিচু। তাই ব্যবসায়ীরা সোনারগাঁওয়ের লিচু সবার আগে বাজারে আনতে পারে। ভরত গ্রামের ব্যবসায়ী রূপন পাল, পানাম নগরীর আলাল, লিটন, টিপরদী গ্রামের হাবিবুর রহমান, খাসনগর দীঘিরপাড় গ্রামের লিচু ব্যবসায়ী মজিবুর রহমান, মনারবাগ গ্রামের লিচু ব্যবসায়ী দুলাল জানান, উপজেলার খাসনগর, চিলারবাগ, দৈলরবাগ, পানাম, কৃষ্ণপুরা, গোবিন্দপুর, দত্তপাড়া, বাগমুছা, অর্জুন্দী, হাতকোপা, দরপত, ছাপেরবন্ধ, গোয়ালদী, টিপরদী, হরিষপুর, ভট্টপুর, লোকশিল্প জাদুঘর, গাবতলী, হারিয়া, বৈদ্যেরবাজার, তাজপুর, সাদীপুর, ইছাপাড়া, দুলালপুর, বারদী, সেনপাড়া, বালুয়া দীঘিরপাড় ও ভরতসহ বিভিন্ন গ্রামে ৩ শতাধিক লিচুবাগান রয়েছে। অন্যান্য লিচুর চেয়ে কদমী লিচু চাষ করে অধিক মুনাফা পাওয়া যায় বলে এ লিচু চাষের প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়ছেন বাগানীরা। এ জাতের লিচু আকারে বড় ও বেশি সুস্বাদু হয়ে থাকে। সোনারগাঁওয়ে সর্বপ্রথম পাতি লিচু পরে কদমী লিচু ও সর্বশেষ বোম্বাই লিচু পাকে। ভরত গ্রামের লিচু ব্যবসায়ী রূপন পাল ও পানাম লাহাপাড়া গ্রামের লিচু ব্যবসায়ী মোঃ আলাল বললেন, সবাই মিলে এখন শুধু লিচুবাগান পাহারা দিচ্ছি। মনের মধ্যে সবার একটাই চিন্তা কীভাবে কাক, বাদুড় আর চোরের হাত থেকে বাগানের লিচু রক্ষা করা যায়। তাই বাঁশের ‘ঠাডা’ বানিয়ে দিন-রাত ঠক-ঠক শব্দ করে কাক, বাদুড় তাড়াচ্ছি। রাতে লিচুগাছের উপর লাইট জ্বালিয়ে বাদুড় তাড়াচ্ছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর ফলন ভাল হওয়ায় বাজারে লিচুর দাম কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সোনারগাঁওয়ের লিচু আকারে একটু বড় ও সুস্বাদু হওয়ায় এ লিচুর চাহিদা বেশি। আর সোনারগাঁওয়ের লিচু সবার আগে বাজারে আসে; তাই এ লিচুর চাহিদা ভিন্ন। সোনারগাঁও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুরাদুল হাসান জানান, সোনারগাঁওয়ে এখন লিচু গাছের সংখ্যা ১০/১৫ হাজার। সোনারগাঁওয়ে মাটি ও আবহাওয়া লিচু চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। বিশেষ করে বাদামী (পাতি), কদমী ও চায়না-৩ প্রজাতির লিচু। সোনারগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা লিচু চাষে ব্যাপক সফলতা পাওয়ায় দিন দিন এ এলাকার মানুষ নতুন করে লিচুর বাগান গড়ায় মনোযোগী হচ্ছেন। অনেকে বসতবাড়ির আঙ্গিনায়, পুকুর পাড়ে ও পরিত্যক্ত জমিতে মাটি ভরাট করে লিচুর চারা রোপণ করছেন।