প্রতিটি মৃত্যুই কাউকে না কাউকে নিভৃতে কাঁদায়

আপডেট : ০৬ মে ২০১৪, ২১:৫৭
সমপ্রতি ঝড়ের কবলে পড়ে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলায় এমভি শাখিল-১ নামের একটি লঞ্চ ডুবে গেছে। শতাধিক যাত্রী বোঝাই লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর ১৭টি লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো কিছু যাত্রী নিখোঁজ আছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। শুধু এমভি শাখিল-১ নয়—প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন নৌরুটে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। অন্য কতগুলো কারণ থাকলেও বৈশাখী ঝড়েই বেশিরভাগ লঞ্চ ডুবে যায় বলে বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা যায়। এমভি শাখিল-১ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও একবার দুর্ঘটনায় পড়েছিল। গত বছর একই সময়ে পদ্মা ও মেঘনাসহ বেশ কয়েক স্থানে কয়েকটি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে যাতে কয়েক শ মানুষ মারা গেছে। একটি লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পরে তাতে কতজন যাত্রী ছিল তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। বিভিন্ন সময় লঞ্চডুবির কারণে গঠিত কমিটির রিপোর্টে দেখা গেছে, সামান্য কয়েকটি কারণে লঞ্চ ডোবে। বৈশাখের তীব্র ঝড় এবং নদীর উত্তালতা থেকে সাবধান থাকলে লঞ্চযাত্রাকে নিরাপদ রাখা যায়। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতরের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নাম থাকলেও এ সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা দিয়ে আমাদেরকে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির কবল থেকে রক্ষা করেছে। যদিও কয়েকটি ঘটনায় ভিন্নতা ছিল। নদী বেষ্টিত বাংলাদেশে নৌযাত্রা সহজলভ্য হওয়ায় দেশের মানুষ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নৌপথেই বেশি যাতায়াত করে। এক্ষেত্রে সরকার নিয়ন্ত্রিত স্টিমার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন লঞ্চ সার্ভিসই প্রধান ভরসা। কখনোই স্টিমারডুবির খবর শোনা না গেলেও প্রতি বছরই লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটছে। লঞ্চের সঠিক আকার, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতায় অনিয়ম, লঞ্চ তৈরির মেটারিয়ালে ভেজাল, দক্ষ চালকের অভাব, আবহাওয়া সতর্কতা অমান্য, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী কিংবা মালামাল বোঝাইয়ের কারণেই লঞ্চ দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। এসব ত্রুটির সঙ্গে দমকা বাতাস কিংবা ঝড়ো হাওয়া হলেই যাত্রী বোঝাই লঞ্চ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। কিছু মানুষ লঞ্চ থেকে বের হতে পারলেও কূল-কিনারাহীন নদী সাঁতরিয়ে তীরে আসতে পারে না যে কারণে তাদেরও মৃত্যু হয়। লঞ্চ দুর্ঘটনায় সাধারণত পুরুষের চেয়ে নারী এবং শিশুদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি থাকে। আবহাওয়া সতর্কতা মেনে, সুষ্ঠু কাঠামোয় লঞ্চ নির্মাণ করে, দক্ষ নাবিক দ্বারা, সঠিক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে লঞ্চ যাত্রা করলে সে যাত্রায় যেমন ভয় থাকে না তেমনি দীর্ঘ পথের যাত্রা হয় আরামদায়ক এবং উপভোগ্য। কাজেই কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা বেশি ঘটার এই সময়টাতে অবশ্যই লঞ্চ যাত্রার প্রতি দৃষ্টি রাখবেন এবং যাত্রীদের মনে রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে কোনো অবস্থাতেই লঞ্চে বা অন্য কোনো বাহনে যাত্রা করা আদৌ উচিত নয়। প্রাকৃতিক কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ লাশের সারিতে যোগ হচ্ছে । কিছু মৃত্যু আছে যা রোধ করা মানুষের অসাধ্য। তবে এমন কিছু মৃত্যু আছে যা অবশ্যই রোধ করা যায়। লঞ্চ দুর্ঘনার মৃত্যুও ঠিক এমন, যাকে রোধ করা যায়। এ মৃত্যুকে সতর্কতার মাধ্যমে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান সময়ে অপহরণ কিংবা গুম করে যাদের মেরে ফেলা হচ্ছে তাদের নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনা চলছে। অবরোধ থেকে শুরু করে অনশন। মানববন্ধন থেকে শুরু করে গভীর রাত্রের টকশোর সবখানেই এ লাশের খবর। লঞ্চে যারা চলাচল করে তারা অতি সাধারণ লোক! তাদের মৃত্যু নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা হবে না—এটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের মনে রাখা উচিত প্রতিটি মৃত্যুই কাউকে না কাউকে নিভৃতে কাঁদায়। কোথাও না কোথাও শূন্যতার সৃষ্টি করে। কাউকে না কাউকে শোকের সাগরে ভাসায়। সুতরাং প্রতিটি মৃত্যুই যেন জাতির পরিচালকদের মাথাব্যথার কারণ হয়। পিরোজপুর