এখানে মূলত শহরের শিশুদের বেড়ে ওঠার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। শিশুদের শিক্ষাদর্শন নিয়ে যাঁরা আলোচনা ও শ্রম স্বীকার করে গেছেন এবং শিশুশিক্ষার পথনির্দেশ করে গেছেন তাঁরা অধিকাংশই শিশুদের প্রকৃতিগত শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃতিবাদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। প্রকৃতিবাদী দার্শনিক রুশোর মতে, শিশুর শিক্ষা হবে প্রকৃতি অনুযায়ী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও প্রকৃতিকেন্দ্রিক শিশুশিক্ষার পক্ষপাতি ছিলেন। অর্থাত্ কোমলমতি শিশুরা জীবনের শুরুতে প্রকৃতিগত শিক্ষাই শিখবে নিজের মতো করে মনের আনন্দে। শিক্ষক ও অভিভাবক মহোদয়ের ভূমিকা সেখানে থাকবে পথনির্দেশকের মতো। অথচ আমাদের দেশে শিশুদের শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পুঁথিগত বিদ্যার প্রাধান্য অধিক, প্রকৃতিগত বিষয়টি সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের দেশে বড় শহরগুলো এখন নিতান্তই প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন। পিচঢালা রাস্তা, ইট-কাঠ-লোহা আর পাথরের ঘর-বাড়ি, উষ্ণ আবহাওয়ায় বেড়ে উঠছে শহরের শিশুরা। ভরসা এতটুকুই যে, মা-বাবা অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য কারো সযত্ন প্রয়াসে বেড়ে উঠছে তারা। প্রযুক্তিগত আনন্দ-বিনোদন ও খেলাধুলা তাদের অন্যতম সঙ্গী। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তাদের জীবনে নেই প্রকৃতিগত আনন্দের অনুষঙ্গ। তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে তাদের পরিচিতি থাকলেও সীমাবদ্ধতার জালে আবদ্ধ তারা। নিজ ঘরে চার দেয়ালের মধ্যে আজ তারা আটকা পড়ে আছে। অনেকাংশে বিদ্যালয়েও তারা পাচ্ছে না খোলামেলা নির্মল প্রকৃতি, উদার মাঠ, বৃক্ষছায়া। মাঠ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে, ফসলের খেত পেরিয়ে, আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসাটা তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের কাছেও এ অভিজ্ঞতা এখন অনেকটা সীমিত। তাই সহজেই অনুমেয়, শিশুরা ক্রমেই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের অনেকেরও দূরত্ব বাড়ছে দিন-দিন। সভ্যতার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও মানুষের শহরকেন্দ্রিকতা এজন্য অনেকাংশে দায়ী। এসব বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। অভিভাবক মহোদয় ব্যস্ততা আর বাস্তবতার নাগপাশ ছিন্ন করে তার প্রিয় সন্তানকে যথাসম্ভব প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেন মাঝে মাঝে। নগরে বেড়ে উঠুক তারা, পরিচয় আর সম্পর্ক থাকুক পল্লিপ্রকৃতি ও নিবিড় অরণ্য প্রকৃতির সঙ্গেও। রাষ্ট্রকেও ভাবতে হবে যেন অবকাঠামোগত যথাযথ পরিবেশে আমাদের প্রাণপ্রিয় শিশু শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করে করে বেড়ে উঠতে পারে। জয় হোক আমাদের ভবিষ্যত্ আজকের শিশুদের।
ঢাকা
