নিহত আইনজীবী চন্দন সরকার এবং প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি না হওয়ায় আগামী রবিবার নারায়ণগঞ্জের র্যাব-১১ এর কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে জেলা আইনজীবী সমিতি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২ টার দিকে জেলা বার ভবনের সামনে এক সমাবেশে এ ঘোষণা দেন সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে আদালতপাড়া প্রদক্ষিণ করে। এছাড়া গতকাল দুপুর ১২ টা থেকে ১টা পর্যন্ত আইনজীবীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে কর্মবিরতি পালন করেন।
সমাবেশে সাখাওয়াত হোসেন খান অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে প্রত্যাহারকৃত ডিসি, এসপি ও র্যাবের সিও এর বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু প্রমুখ। জাকির হোসেন বলেন, যেদিন চন্দন সরকার নিখোঁজ হন সেদিন আমরা র্যাবের কাছে গেলেও র্যাব পাত্তা দেয় নাই। তিনি প্রত্যাহারকৃতদের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে গ্রেফতারের দাবি জানান।
আসামিরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে এমন তথ্য নেই : পুলিশ সুপার
মামলা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেছেন, মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমরা তদন্তে বেশ কিছুদূর এগিয়েছি তবে তা যথেষ্ট নয়। বর্তমানে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আমরা এগুচ্ছি। তবে আসামিরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। র্যাবের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে তদন্ত করা আমাদের কাজ নয়, মামলার তদন্ত করা আমাদের কাজ। এ ব্যাপারে আমরা কোন ইনস্ট্রাকশনও পাইনি। গতকাল দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান পুলিশ সুপার।
নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে তিনি বলেন, মামলার তদন্তের অগ্রগতির জন্য দরকার বিধায় লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। অস্ত্রগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
বন্দরে ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ নিখোঁজের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, বন্দরে নিখোঁজ ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ সব সময়ই একাউন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করতেন। কিন্তু এই প্রথম তিনি নগদ অর্থ নিয়ে লেনদেন করতে গিয়েছিলেন। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে পুলিশ চেষ্টা করছে।
প্রশাসনের লোকজনও জড়িত: নজরুলের স্ত্রী
নিহত সিটি প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি দাবি করেছেন, তার স্বামীসহ সাত খুনের ঘটনার সঙ্গে প্রশাসনের লোকজনও জড়িত ছিল। এত বড় একটা ঘটনা নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের পক্ষে একা ঘটানো সম্ভব নয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাত্ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
তিনি ও তার পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে সেলিনা ইসলাম বলেন, নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা গ্রেফতার না হলে সিদ্ধিরগঞ্জে কেউ নিরাপদ নয়। স্বামীর লাশ পাওয়ার পর দুই দিন হুমকি এসেছিল। এখনও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।
পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাত্ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সদ্য দায়িত্ব নেয়া পুলিশ সুপার আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, দ্রুত খুনীদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি নজরুল ইসাম ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছিল, সেই মামলার ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বাবা সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম, ভাই আব্দুস সালাম, শ্যালক সাইদুল ইসলাম এবং সমপ্রতি নূর হোসেনের চাচাতো ভাই মোবারকের দায়েরকৃত মামলার আসামিরা। নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম গত ক’দিন ধরে র্যাবের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ মৌখিকভাবে করেছিলেন তা গতকাল লিখিত আকারে জমা দেন।
নূর হোসেনের ভাইয়ের শটগান জব্দ, বালুমহাল উচ্ছেদ
নূর হোসেনের ভাই নূরউদ্দিনের বাড়ি থেকে তার শটগানটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। পলাতক নূর হোসেন এবং তার স্বজন ও সহযোগীদের ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের একদিন পর গতকাল মঙ্গলবার সিদ্ধিরগঞ্জের বাতেনপাড়া এলাকায় নূরউদ্দিনের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল মতিন বলেন, নূর হোসেনের সহযোগী জামালউদ্দিনের বাড়িতেও অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় আরেকটি শটগান। তিনি বলেন, নূরউদ্দিন মিয়া ও জামালউদ্দিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র দুটি পাওয়া গেছে। যে ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স সোমবার বাতিল করে জেলা প্রশাসন তার মধ্যে এই দুটি শটগানও রয়েছে।
এদিকে মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের বালুমহালে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লি¬উটিএ) উপ-পরিচালক আলমগীর কবির, যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল কাশেম মোহাম্মদ শাহীন উচ্ছেদ অভিযান চালান। আলমগীর কবির বলেন, কাঁচপুর সেতুর নিচে শীতলক্ষ্যার তীরে নূর হোসেন ও তার ভাই নূরুউদ্দিন ওরফে জজ মিয়ার দখলে থাকা পাথর-বালুমহালে ৬০ টি জেটি, ৫০ গদি ঘর, ২৫ টি অফিস উচ্ছেদ করা হয়েছে ।
