শ্রমিকদের অধিকার ও নৈতিকতা

আপডেট : ০৭ মে ২০১৪, ২১:২৬
রানা প্লাজা ট্রাডেজির বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রদানকৃত এক বিবৃতিতে গত ২৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রবার্ট মেনেন্দেজ বলেছেন, ‘বিজিএমইএ ও সরকারকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের রক্তের দাগ লেগে থাকা পোশাক পশ্চিমা ক্রেতারা আর কিনবে না।’ তিনি বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তাসহ তাদের বেশ কিছু অধিকার রক্ষার ব্যাপারে আহ্বান জানিয়েছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিতই রাখা হবে। উল্লেখ্য যে, শুল্ক ছাড় সংক্রান্ত এই সুবিধা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র স্থগিত করেছে। আমাদের দেশের পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে অত্যন্ত সুনামের সাথে রপ্তানি হয়ে আসছিল। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লিখিত পোশাক পশ্চিমাদের নিকট বিশেষ আকর্ষণ বহন করে আসছে। সে ক্ষেত্রে কোনো অবনতি এবং পোশাক বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কোনো সুবিধা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হোক এটা বিজিএমইএ, সরকার এবং শ্রমিকগণসহ বাংলাদেশের কোন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। তবে এর সাথে সাথে এদেশের অধিকার বঞ্চিত অবহেলিত এমনকি নির্যাতিত শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টিও সর্ব মহলের মনে রাখা উচিত। যাদের পরিশ্রম ও কর্মকুশলতার কারণে এদেশের পণ্য গুণগত মানে বিশ্বের সর্বত্র শ্রেষ্ঠতম হতে পেরেছে তাদেরকে বঞ্চিত করে, তাদের জীবনের নিরপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল পুঁজিপতি বা ধনী মালিক শ্রেণির ধন-সম্পদ বৃদ্ধির উপায় বা মাধ্যম হিসেবে শ্রমিকদের ব্যবহার করা নৈতিকভাবে সঙ্গত হতে পারে না। আমাদের দেশে পোশাক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিকদের যে মজুরি প্রদান করা হয় তা সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য মোটেই পর্যাপ্ত নয়। যে পোশাকের বিশ্বময় এত সুনাম এত বাজার যা বিক্রয় করে হাজার হাজার কোটি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে তথা পুঁজিপতিদের পকেটে আসে সেই পণ্যের তৈরিকারকদের পর্যাপ্ত মজুরি দিতে বাধা কোথায়? আসলে সামাজিকভাবে এদেশে এখনও শ্রমিক শ্রেণিকে মানবিক মর্যাদার অনেক মৌলিক দিক থেকে খাটো করে দেখা হয়। একজন উচ্চবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার জন্য যা একান্ত প্রয়োজনীয় বলে ভাবা হয় একজন নিম্নবিত্ত বা শ্রমিক শ্রেণির মানুষের জন্য তেমনটি কামনা করতে অনেকেই বিশেষ করে পুঁজিপতি কারখানা মালিকগণ অভ্যস্ত নন বা মানসিকভাবে প্রস্তুত নন। এমনকি শ্রমিকদের বা ঐ শ্রেণির মানুষদের যথাযথভাবে মানুষ বলে স্বীকার করতেও তারা প্রস্তুত কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। কেননা গ্রামের একজন দরিদ্র চাষিও তার গরু-ছাগলের প্রতি যে যত্ন নেন বা তাদের খাদ্য, বাসস্থান এবং নিরাপত্তা নিয়ে যতটা যত্নবান থাকেন এক শ্রেণির কারখানা মালিক তার অধীনস্থ শ্রমিকদের বেলায় অনেক ক্ষেত্রে তেমনটিও ভাবেন না। ভাবলে হয়তো রানা প্লাজা ট্রাজেডি হতো না। বাংলাদেশে উচ্চবিত্ত শ্রেণি বা কোনো বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা বিপর্যয় হলে তা দ্রুত সমাধান করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়; অনেক ক্ষেত্রে অনেক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির নিরাপত্তা, মজুরি ইত্যাদি সমস্যার কোনো জরুরি সমাধান হয় না। এদের কোনো কোনো বিশেষ সমস্যারও জরুরি সমাধান হয় না। এমনকি সমস্যা সমাধানের সকল সুযোগ থাকলেও সমাধান করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে রানা প্লাজায় নিহত, নিখোঁজ, পঙ্গু শ্রমিকদের তথাকথিত ক্ষতিপূরণের জন্য দেশি-বিদেশি অনেক সাহায্য উদ্যোগ আন্তরিকতা থাকলেও এই ক্ষতিপূরণ কার্যটি গতিশীল হচ্ছে না। শ্রমিকদের সাথে এতটা নির্মম ব্যবহার করা সত্ত্বেও এদেশের বিভিন্ন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের অভাব হয় না। এর কারণ হলো এদেশে অভাবী মানুষের আধিক্য। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও পেটের দায়ে নিতান্ত জৈবিক প্রয়োজনেই তারা পা দেয় মৃত্যু ফাঁদে। অভাবী মানুষের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছেন পুঁজিপতি মালিক শ্রেণি। দুর্ভাগা এই শ্রমিকদের রক্তে ভেজা পোশাক সাদা ত্বকের মানুষের নিকট উচ্চমূল্যে রপ্তানি করে এদেশের শিল্প-মালিকগণ উন্নত বিশ্বের ধনিদের চাইতেও ক্ষেত্রবিশেষে উন্নত গাড়ি, বাড়ি তথা নানারকম সম্পদের মালিক হন, বিদেশি ব্যাংকেও তাদের অলস টাকা থাকে; থাকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হোম হিসেবে বিদেশে জমি-জায়গা, ঘর-বাড়ি। এসবের ভিড়ে তারা ভুলে যান শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির মাত্রা, মানবিক মূল্য প্রদান করার কথা, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঝুঁকির কথা। বিদেশি ক্রেতারা বা পশ্চিমা বিশ্বের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দেশের কর্তাব্যক্তিরা যা বলেন তার অনেক রকমের ব্যাখ্যা এদেশে হয়। তবে তারা তাদের স্বার্থে অবশ্যই কথা বলতে পারেন। তাদের দেয়া নির্দেশনা সবটা মানা সম্ভব এমনকি সঙ্গত নাও হতে পারে। তবে পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে এদেশে যে চরম বৈষম্যমূলক অনৈতিক ঘটনা ঘটছে তা সাধারণ চোখেই দৃষ্টিগোচর—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।  লেখক :দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স [email protected]