জ্বালানি হিসাবে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার যেমন দিন দিন বাড়িতেছে, তেমনি বাড়িতেছে এই সংক্রান্ত দুর্ঘটনাও; কিন্তু সেই অনুপাতে এই নিয়া জনগণের মাঝে তেমন সচেতনতা পরিলক্ষিত হইতেছে না। প্রায়শ নানা স্থানে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটিতেছে। সম্প্রতি গাজীপুরে একই পরিবারের চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছে গ্যাস সিলিন্ডারে লিকেজ হইয়া ঘটিয়া যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের কারণে। গাজীপুর মহানগরীর ইসলামপুর শরীফ মার্কেট সংলগ্ন একটি বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। গ্যাসের চুলার পাইপ লিকেজ হইয়া আগুন ধরিয়া গেলে ইহাতে গৃহকর্তা, তাহার স্ত্রী ও তাহাদের দুই শিশু সন্তান অগ্নিদগ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধ হইয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দেওয়া এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বত্সর ঢাকা বিভাগে গ্যাস দুর্ঘটনায় ১০৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহার মধ্যে গ্যাসলাইন লিকেজে ৫৫টি এবং এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঘটিয়াছে ৫৩টি অগ্নিকাণ্ড । এইসব দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন অর্ধশত মানুষ । পঙ্গুত্ব বরণ করিয়াছেন অন্তত ১২/১৩ জন।
এখানে একটি বিভাগের দুর্ঘটনার বিবরণ দেওয়া হইয়াছে মাত্র; কিন্তু এমন চিত্র সারাদেশেই বিদ্যমান। আমাদের দেশে জ্বালানি হিসাবে গ্যাসের ব্যবহার প্রধানত দুই প্রকারে হইয়া থাকে। সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে ও সিলিন্ডারে তরলীকৃত গ্যাস (এলপিজি) হিসাবে। সাম্প্রতিককালে গৃহস্থালিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারকে নিরুত্সাহিত করিয়া তাহার পরিবর্তে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) জনপ্রিয় করিবার উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। বর্তমানে প্রায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহার হইতেছে। সাধারণত এলপিজি ভর্তিজনিত কারণে কোনো সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে না, প্রকৃতপক্ষে সিলিন্ডার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম না জানা, অসতর্কতা এবং সঠিক পরিবেশে সিলিন্ডার ব্যবহার না করিবার কারণে এইরূপ দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। তাহার সহিত সিলিন্ডারের গুণগত মান যাচাই না করাটাও দুর্ঘটনার বড় কারণ। একটি সিলিন্ডারের আয়ুষ্কাল সাধারণত ১৫ বত্সর। ইহাছাড়া নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি সিলিন্ডার ৫ বছর অন্তর অন্তর ইহা গ্যাস পরিবহনের উপযোগী কিনা তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিবার কথা। যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে তাত্ক্ষণিকভাবে সিলিন্ডার বাতিল করিতে হয়; কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম মানা হইতেছে না। এলপিজির চাহিদা বাড়িয়া যাওয়ায় নূতন সিলিন্ডার আনা হইতেছে ঠিকই; কিন্তু তাহার সহিত যুক্ত হইতেছে পুরাতনগুলোও; কিন্তু পুরাতন সিলিন্ডারে গ্যাস ভরিবার পর ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহারে তাহা কতটা নিরাপদ, তাহা নিয়া প্রশ্ন থাকিবার পরও সিলিন্ডার পরীক্ষায় নেওয়া হইতেছে না তেমন কোনো উদ্যোগ। সিলিন্ডারের মান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে চরম ঘাটতি হইতেই বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িতেছে দিন দিন। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদাসীনতা কাম্য নহে।
সার্বিকভাবে এইসব দুর্ঘটনা এড়াইতে কিছু কিছু ব্যাপারে আমাদেরও অধিকতর সচেতন হইতে হইবে, যেমন- সিলিন্ডার চুলা বা আগুনের পার্শ্বে রাখা যাইবে না, রান্না শেষে চুলা ও এলপিজি সিলিন্ডার রেগুলেটরের সুইচ অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে, রান্নার আধা ঘণ্টা আগে ঘরের দরজা-জানালা খুলিয়া দিতে হইবে, এলপিজি সিলিন্ডার খাড়াভাবে রাখিতে হইবে, কখনোই উপুড় বা কাত করিয়া রাখা যাইবে না এবং রান্নাঘরের উপরে ও নিচে ভেন্টিলেটর রাখিতে হইবে। মোটকথা, ব্যবহারকারী, উত্পাদনকারী ও বিপণনকারীসহ সবাইকে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারে অধিকতর সচেতন হইতে হইবে।
