নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কমিটির প্রধান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহজাহান আলী মোল্লা বলেছেন, তারা সাত দিনের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতির প্রতিবেদন আদালতকে দেবেন। পাশাপাশি তদন্তের প্রয়োজনে যাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আরো তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে একজন নারীও আছেন। তবে তাদের কি ধরনের সম্পৃক্ততা তা বলেননি পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন। এছাড়া আসামিদের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৪ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। আর ঘটনার ১০ দিন পর নিহত চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার বুধবার রাতে ফতুল্লা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি।
ঘটনাস্থলে প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি
প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির প্রধান শাহজাহান আলী মোল্লাসহ কমিটির অন্য সদস্যরা গতকাল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ উদ্ধারের স্থান পরিদর্শন করেন। এর আগে তারা অপহরণের স্থান এবং তারও আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। সেখানে শাহজাহান মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনাস্থলে গেছেন তারা। তদন্তের স্বার্থে এবং সঠিক তথ্য বের করতে যে কোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। হাইকোর্ট গণতদন্তের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে প্রশাসনের কোনো সদস্য বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না, তা উদঘাটন করতে বলেছে। অপহরণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপহূত ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তাও খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কমিটি প্রধান বলেন, যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয়া হবে। সাক্ষীরা যেখানে নিরাপদ মনে করবেন সেখানে নিয়েই তাদের সাক্ষ্য নেয়া হবে।
তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আব্দুল কাইয়ুম সরকার ও আবুল কাশেম মহিউদ্দিন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. শফিকুর রহমান ও সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার, আইন ও বিচার বিভাগের উপসচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও মো. মিজানুর রহমান খান।
আরো তিনজন গ্রেফতার, রিমান্ডে
পুলিশ সুপার খন্দকার মুহিদ উদ্দিন জানান, সাত খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে মিন্টু, মাসুমা ও টিপু নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের দু’জনকে নরসিংদী থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে এ ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে নূর হোসেন ও মো. ইয়াসিনসহ মামলার আসামিদের কেউ এখনো গ্রেফতার হয়নি।
গতকাল কাউন্সিলর নজরুলসহ সাতজনকে অপহরণের স্থান এবং যেখানে তাদের লাশ পাওয়া গেছে সেই দুই স্থান দেখে এসে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন পুলিশ সুপার। তদন্তের স্বার্থে গতকাল গ্রেফতারকৃত তিনজনের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করেন পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার বলেন, লাশ উদ্ধারের পর নজরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে করা অপহরণের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া চন্দন সরকার হত্যার ঘটনায় গত বুধবার তার জামাতার করা হত্যা মামলাটিও তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আউয়ালকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়। হত্যাকাণ্ডে র্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় এই বাহিনীকে তদন্ত সংক্রান্ত কাজ থেকে দূরে রাখতে বলেছে আদালত। তবে আউয়ালের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনের সখ্যের অভিযোগ নজরুলের পরিবার তোলার পর বুধবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে ডিবির ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডলকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার বলেন, আমি সবচে ভালো তদন্ত কর্মকর্তা খুঁজে দায়িত্ব দিয়েছি।
আটদিনে তদন্তের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি আছে কি না-জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, এটি একটি বড় আকৃতির পরিকল্পিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। এ ধরনের মামলার তদন্তের সময় যথেষ্ট পরিকল্পনা করে এগুতে হয়, যেন কোনো ত্রুটি থেকে না যায়। আমরা রাতারাতি কোনো বিপ্লবাত্মক তদন্ত করতে পারি না। একটু সময় লাগবে।
আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, ৭ খুনের ঘটনায় একজন নারীসহ তিনজনকে গত বুধবার রাতে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কারারচর গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হলেন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাসুমা, মিন্টু ও টিপু। হত্যাকাণ্ডের পর তারা গা-ঢাকা দিয়েছিল। গতকাল বিকালে এই তিন জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। পরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনোয়ার বেগম তাদের ৩ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, খুনিদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে নজরুলের স্বজন ও এলাকাবাসী গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মৌচাক এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে। মানববন্ধনে নজরুলের স্ত্রী দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। এসময় নজরুলের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম বলেন, নরসিংদী থেকে ৩ জনকে গ্রেফতার করাটা আইওয়াশ মাত্র। তিনি অবিলম্বে প্রধান আসামি নূর হোসেনসহ সকলকে গ্রেফতারের দাবি জানান।
নজরুলের বাসায় বিএনপির নেতৃবৃন্দ
নিহত নজরুলের বাসায় গতকাল সকালে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহসহ বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। হান্নান শাহের সাথে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা। হান্নান শাহ নজরুলের স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের খোঁজ-খবর নেন এবং তাদের সমবেদনা জানান। বিএনপির এই প্রতিনিধি দল এর আগে অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের বাসায় গিয়ের তার স্বজনদের সমবেদনা জানায়।
