রংতুলিতে গল্প বলেন

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ১৯:৩৭
মাসিক ম্যাগাজিন আর পত্রিকা—এই দুইয়ের মাধ্যমেই কার্টুনের সাথে প্রথম পরিচয় হয় তার। সেগুলো সম্পর্কে জানার আগ্রহটা বেড়ে চলল দিনে দিনে। নিতান্তই শখ মেটাতে সে ভর্তি হলো ঢাকার আর্ট কলেজে। এবার শুরু নিজের আঁকাআঁকি। শখ করে ছবি আঁকতে শুরু করা সেদিনের সেই বালকটিই আজকের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। তার শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্যের গল্প নিয়েই আজকের ‘তাহার তারুণ্যে’। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র স্কুলে ভর্তি হতে হবে ছেলেকে। মা সুন্দর সাজপোশাক দিয়ে তৈরি করে বললেন, ‘যাও বাবা স্কুলে গিয়ে খেল!’ তিনি দিব্যি খেলার মন নিয়ে স্কুলে গেলেন। তখনও ক্লাসে কেউ আসেনি। একটু পর দেখা গেল মাস্টারমশাই এসে নামতা পড়ানো শুরু করেছেন। তিনি তো তা পড়তে নারাজ। কান্না জুড়ে বসলেন, শিক্ষক না পেরে তাকে বাড়িতে দিয়ে গেলেন। এই ছেলেটাই আজকে বাংলাদেশের শীর্ষ শিল্পী রফিকুন নবী। কার্টুন আকার সুবাদে তিনি পরিচিতি পান রনবী হিসেবে। চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী অথবা কার্টুনিস্ট রনবী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। রফিকুন নবীর মাতুল ও পৈতৃক দুই পরিবারই ছিল সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। গোবরাতলা মহানন্দার তীর ঘেঁষে যে গ্রামটি, সেটিই ছিল তার মাতুলালয়। পৈতৃক ভিটে ছত্রাজিতপুর, শিবগঞ্জ উপজেলায়। মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন ছোটখাটো জমিদার পরিবারের সন্তান। পিতা রশীদুন নবী ও পিতামহ মহিউদ্দীন আহমেদ দু’জনই ছিলেন পুলিশ অফিসার। রফিকুন নবীর পিতা রশীদুন নবীর ইচ্ছে ছিল শিল্পী হবেন। তত্কালীন কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়ার জন্য রশীদুন নবী তার পিতা মহিউদ্দিন আহমেদের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু পিতা মহিউদ্দীনের অনুমতি মেলেনি। রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর কাছে যান রশীদুন নবী। তার কাছে শেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিতার মতো পুলিশের পেশাক গ্রহণ করলেও শিল্পী হওয়ার আগ্রহটা কখনও হারাননি। শখ করে ছবি আঁকতেন তিনি। কথাবার্তা, আচার-আচরণে তার অন্তরলোকের শিল্পীকেই খুঁজে পাওয়া যেত। নিজের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্ত করতে ছেলে রফিকুন নবীকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন আর্ট কলেজে। আর অবসরকালীন জীবনে মাটি দিয়ে অনেক প্রতিকৃতিমূলক মডেলিং করেছেন। পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় স্থায়ী হন তারা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর। ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। তারা থাকতেন নারিন্দা এলাকায়। এখানে থাকতেন সেই সময়ের অনেক নামীদামি লোক, ইত্তেফাকের তত্কালীন সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিনের মতো লোকেরা। সেখানে অভিযাত্রিক নামে এক সংগঠন ছিল। সেখানেও তারা যেতেন নিয়মিত। আর যেকোনো ধরনের ছবি আঁকা বা অলঙ্করণের কাজ হলে তো কথাই নেই। তার ডাক পড়ত সবার আগে। সেই সূত্রেই সবাই তাকে বলল আর্ট কলেজে ভর্তি হতে। পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসানসহ খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন। আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষে থাকতে নিজের আঁকা ছবি প্রথম বিক্রি করেন ১৫ টাকায়। স্থানীয় সংবাদপত্রে রেখাচিত্র এঁকে এবং বুক কভার ইলাস্ট্রেশন করে পরিচিতি লাভ করেন দ্বিতীয় বর্ষেই। ১৯৬২ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তি লাভ করেন তিনি। ’৬৪ সালে স্নাতক পাস করেন। জলরং ছাড়াও অন্য সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন রফিকুন নবী। প্রকৃতি, মানুষের পাশাপাশি এঁকেছেন পশু-পাখি। দক্ষতা দেখিয়েছেন লেখার জগতেও। লেখালেখির শুরু সেই স্কুলজীবন থেকেই। তার প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৭-১৯৫৮ সালের মাঝামাঝিতে ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে। ‘টোকাই’ শিরোনামে প্রথম স্ট্রিপ কার্টুনটি ছাপা হয় বিচিত্রার প্রারম্ভিক সংখ্যায় ১৯৭৮ সালের ১৭ মে। প্রথম কার্টুনে টোকাই একজন বড় কর্মকর্তা। প্রথম কার্টুনেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেল টোকাই। নিয়মিত বিচিত্রায় ছাপা হলো টোকাই। বিচিত্রা বন্ধ হলে ২০০০ সাল থেকে সাপ্তাহিক ২০০০-এ আবার শুরু করেন টোকাই। বছর চারেক পরে নিয়মিত টোকাই আঁকায় যতি টানেন রনবী। কলেজজীবন থেকেই রফিকুন নবীর আঁকা ছবি স্থান করে নেয় বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। ১৯৬০ থেকে ’৬৪ পর্যন্ত ঢাকার কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফেটর বার্ষিক প্রদর্শনীতে, ’৭৬-এ এথেন্সে। টোকাইয়ের ২৫ বছর পূর্তিতে গ্যালারি চিত্রকে একক প্রদর্শনী হয় ২০০৪ সালে। ২০০০-এ চারুকলা ইনস্টিটিউটের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অংশগ্রহণ করেন জয়নুল গ্যালারির যৌথ প্রদর্শনীতে। দেশের বাইরে ভারত, গ্রিস, যুগোস্লাভিয়া, জার্মানি, মালয়েশিয়া, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, রুমানিয়া, ইরান, চীন, জাপান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েনা, বুলগেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত সব জাতীয় প্রদর্শনী ও সব দ্বিবার্ষিক এশিয়ান প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। দেশের জাতীয় আর্ট গ্যালারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গভবন, সংসদ ভবন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সংগ্রহশালা ইত্যাদি স্থানে তার চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। এছাড়া জর্ডানের রয়্যাল মিউজিয়ামে, গ্রিসের এথেন্সে, যুগোস্লাভিয়া এবং জাপানেও রয়েছে তার চিত্রকর্মের সংগ্রহ। গম্ভীর চেহারার রফিকুন নবীর মাঝে সৃষ্টিশীলতার সাথে খেলে যায় রসবোধ। নিসর্গের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রংতুলি হাতে তার প্রেমে নিজেকে হারাতে ভালোবাসেন শিল্পী। আবার সমাজ ও রাজনীতি সচেতন রনবী ভাবেন সাধারণ মানুষের কথা, পথ-শিশুদের দুঃখ-দুর্দশাকে দেখেন বড় করে। শিল্পীর শিল্প-পরিমণ্ডল জুড়ে তাই স্থান করে নিয়েছে বাস্তব আর কল্পনার সম্মিলন। এক সত্তা যখন সুন্দরের পূজা করতে ব্যস্ত, অন্য সত্তা তখন সমাজ-বাস্তবতার অসঙ্গতিগুলোকে বিদ্রূপ করে কঠোরভাবে। শত ব্যস্ততার জীবনে আঁকার জগতটিই শিল্পীর সবচেয়ে বেশি প্রিয়। নিসর্গ-প্রেম আর টোকাই—এই দুই জগতকে নিয়েই রফিকুন নবী লালন করে চলেছেন সময়ের পথে তার সাহসী যাত্রা।