আর মাত্র এক সপ্তাহ পরই বিশ্বের অন্যতম বহত্ গণতান্ত্রিক দেশের মসনদের অধিপতি কে হচ্ছেন; নিশ্চিত হওয়া যাবে। ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত প্রায় ৪০ দিনের এই ভোটযজ্ঞ শেষ হতে চলেছে আর মাত্র কদিন পর, ১২ মে। ফলাফল ১৬ মে। প্রতিবেশী এই রাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের মোড়কে ঢাকা। স্বাধীনতায় ভারতের ভূমিকা যেমন ছিল, তেমন পরবর্তীতেও নানা বিপদ-আপদে এই ভূ-ভারত এবং সেই দেশের সাধারণ জনগণকে পাশে পেয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের মতোই বরাবর কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায় সব সময় অটুট থেকেছে। দু’একটি ঘটনায় একটু শীতল হলেও পারস্পরিক স্বার্থের কারণে দ্রুত তা উষ্ণতা ছড়িয়েছে।
চলমান লোকসভা নির্বাচনে কে ক্ষমতায় যাচ্ছে বা কে বিরোধী দলে থাকছে এই সব নিয়ে ভারতের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আগ্রহের বিষয়বস্তুতেই পরিণত হয়েছে কয়েক মাস ধরে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো, পত্র-পত্রিকায় ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খবরের গুরুত্ব বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন নিঃসন্দেহেই এটা বলতেই হবে। আর ওই আগ্রহের পারদ ক্রমে চড়ছে গ্রীষ্মের দাবদাহ যেমন বাড়ছে তেমন করে। নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং পরবর্তীতে দেশটির কেন্দ্রীয় শাসক হিসাবে কোন রাজনৈতিক দলকে জনগণ দেশ চালানোর ব্যাটন তুলে দেন, সেটিও এখন অপেক্ষাতুর দৃষ্টিতে দেখছেন বাংলাদেশের মানুষ।
এবারই প্রথম মনে হচ্ছে কংগ্রেসের প্রবল প্রতিপক্ষ হিসাবে বিজেপি উঠে এসেছে। এমন কি মিডিয়া এবং স্থানীয় মানুষের মতেও বিজেপি নাকি এবার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসতে পারে; এমনটাও মনে করা হচ্ছে। কংগ্রেসের মতো সেক্যুলার রাজনীতিক দল এলে তেমন চিন্তার বিষয় না হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী বিজেপি ক্ষমতায় এলে একটু-আধটু চিন্তার কারণ হয়ে যায় বৈকি। মানুষের ভাবাবেগে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বিষয়ে বিজেপি আঘাত এনে রেখেছেই। এটা ধ্রুব সত্য। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ’বাংলাদেশি খেদাও’ এই ডাক দেয়ায় ভারতের বাংলা ভাষাভাষি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরায় যেমন বিজেপির বিপক্ষে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ইস্যু করেছে, ঠিক তেমনই ’বাংলাদেশি খেদাও’ এইভাবে হুমকি দেয়ায় বাংলাদেশের মানুষও কিন্তু বেশ হতাশ, ক্ষুব্ধও বিজেপির উপর। যদিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ; দলটির সামগ্রিকভাবে তেমন কিছু যায় আসে না। তবুও তিস্তা-ছিটমহল ইস্যুতে তৃণমূল সভানেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ‘নেতিবাচক’ অবস্থানের পর যেভাবে মমতার জনপ্রিয়তার ধস নেমেছিল বাংলাদেশে, তাতে কিন্তু কিছুটা হলেও মমতা পরবর্তীতে এর আঁচ পেয়েছেন। ভারতে অবস্থানরত বহু পূর্ব-বাংলার ভোটার কিন্তু এখনও মনেপ্রাণে বাংলাদেশের ভালটাই চান, চাইবেনও। যে কারণে মমতার ভোট বাক্সে কিছুটা হলেও তিস্তা-ছিটমহল ইস্যুতে ভোট কম পড়তে নিজের বাংলাতেই। এমনটাও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকের মুখেই শুনতে পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং কোচবিহার জেলায় এ রকমই প্রভাব পাওয়া যাচ্ছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকরাও স্বীকার করছেন। তারা বলছেন, ১৯৭১ সাল কিংবা তার পরে নানা কারণে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন তারা তো এখন রাজ্যের ভোটার। তাই বাংলাদেশ ইস্যুতে নেতিবাচক কোন উদ্যোগ বা মন্তব্য হলে এই সব ভোটারদের মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
বিজেপির ক্ষেত্রে কিন্তু এবার পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশি ইস্যুতে কথা বললে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই প্রথমে তীব্র আপত্তি ওঠে। শুধু তাই নয়, বামপন্থী সুশীল সমাজের বহু বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও আগে এর সমালোচনায় মুখর হন। সে কারণে ২৭ এপ্রিল শ্রীরামপুরের ‘বাংলাদেশি খেদাও’ এই ডাক দেয়ার মাত্র সাতদিনের মধ্যে বাঁকুড়া-আসানসোলে গিয়ে মোদিকে এই ইস্যুতে কার্যত বেক-ফুটে যেতে হয়েছে। নরেন্দ্র মোদিকে বলতে হয়েছে, ‘আসলে আমি অবৈধ অনুপ্রবেশকারিদের তাড়ানোর কথাই বলেছি, উদ্বাস্তুদের রক্ষা করাই বিজেপির ধর্ম’। আর অন্যদিকে বাংলাদেশি সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতেও শুরু করেছেন মমতা। কারণ তিনি ভাল করেই জানেন, উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় তার যে পরিমাণ পূর্ব বাংলার মানুষের ভোট রয়েছে; বিজেপির ‘বাংলাদেশি খেদাও’ এই ইস্যু সামনে আনলে তার অন্তত সিংহভাগ তৃণমূলের ভোট বাক্সে গিয়ে পড়বে। ফলে ‘হাতে গরম পাতে গরম’ বাংলাদেশি খেদাও ইস্যুতে বিজেপি-তৃণমূলের ভোট ভাগাভাগির যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে সেখানে। এতেই পরিষ্কার বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনও সিদ্ধান্ত ইচ্ছা করলে ভারত নিতে পারবে না। এতে তাদের নিজের দেশের মধ্যেই এক ধরনের প্রতিবাদ উঠবে। বিশেষ করে, ভোট ব্যাঙ্কের কথাটিও রাজনৈতিক দলগুলো সূক্ষ্মভাবে ভাবেন। আর তাই ২০০৫ সালে লোকসভা মমতা একই ভাবে বাংলাদেশি খেদাও-এই ডাকে সরব হলেও ২০১৪ সালে উল্টো সুর ধরে ওই কথিত বাংলাদেশি ভোটারদের বাঁচাতে প্রয়োজনে রাতে পাহারা দেয়ার ঘোষণা করেন। এই হচ্ছে রাজনীতি!
এবার মূল কথায় ফেরা যাক। কংগ্রেস কিংবা বিজেপি যেই ৫৪৩ আসন বিশিষ্ট ভারতের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে সরকার গঠন করুক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তেমন বড় ধরনের কোন পরিবর্তন হবে না বলে ভারতের বেশ কয়েকজন বিশ্লেষকের মত। তারা বলছেন, দেশটির পররাষ্ট্রনীতি যখন তৈরি হয় তখন সরকারি দল বিরোধী দল ছাড়াও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেই চূড়ান্ত করা হয়। তাছাড়াও বাংলাদেশের সঙ্গে কংগ্রেস কিংবা বিজেপি দুই দলের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলার ইতিহাস ‘ইতিবাচক’। ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী ৬০ বছর কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। এরশাদ, বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কংগ্রেসের সরকারের সম্পর্ক ইতিবাচক ছিল। একই সঙ্গে বিজেপি যখন ছিল তখন বিএনপি সরকারের ছিল। সেই সময়ও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। তত্কালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির ঢাকা সফর ছিল ফলপ্রসূ। ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দিল্লি সফর করেছিলেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলেও বাংলাদেশের সঙ্গে কুটনৈতিক ক্ষেত্রে তেমন কোন পরিবর্তন আসবে না। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে এবং সেটি প্রত্যেক দেশই করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সময় দিল্লির সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকে আবার বিএনপির সঙ্গে এক ধরনের। বিএনপি এলে এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তারাও তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণ করেন; খুব স্বাভাবিক এই বিষয়টি। আন্তর্জাতিক বিষয়ক কলকাতার গবেষক শৈবাল ব্যানার্জির মতে, উপমহাদেশে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলাই হচ্ছে এই মুহূর্তে প্রায় প্রত্যেক দেশের বিদেশনীতি। মুম্বাই ঘটনার পরও ভারত কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খুব কড়া অবস্থান নেয়নি। কারণ প্রত্যেক প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে অবশ্যই রাজনৈতিক সম্পর্কটা কিন্তু সরাসরি নানা ভাবেই কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব ফেলে। এই উদাহরণ দেয়ার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে যে সরকারই থাকুক ভারত তার সঙ্গেই সুসম্পর্ক নিয়ে কাজ করবে। পাল্টা ভারতের যে সরকারই থাকুক না কেন ঢাকাও একইভাবে সেই সম্পর্কের রাস্তা ধরেই হাঁটবে। এটাই এখন উপমহাদেশের কূটনীতির বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে গিয়েছে। তবে এটা ঠিক প্রশ্ন আসতে পারে কংগ্রেসের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে বা হওয়া রয়েছে সেগুলো বিজেপির সময় বাস্তবায়ন কত দ্রুত হবে কিংবা দেরি করা হবে কিনা। এটা আসলে কিছুটাতো রাজনৈতিক সম্পর্কের উপর নির্ভর করবেই। তবে বিজেপি ভোটের বাজারে বাংলাদেশি খেদাও- বা অনুপ্রবেশকারি হাটাও ইত্যাদি মুখে যাই বলুন এইগুলো শাসক বিজেপি বাস্তবায়ন করবে না বলেই মনে করেন কলকাতার বর্ষীয়ান সাংবািদক এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ক প্রখ্যাত বিশ্লেষক অমিত বসু। তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলেও দেশের ২৮ টি রাজ্যের সরকারকেও গুরুত্ব দিতে হয়। কেন্দ্রে ক্ষমতা এলেও যে কোন জোট বা দল এককভাবে দেশ চালায়- এই কথা ঠিক নয়। তাছাড়াও বিজেপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন কিন্তু পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দিল্লির সুসম্পর্ক ছিল অনেক বেশি সুদৃঢ়। ওই সময় করাচি-দিল্লি বাস-ট্রেন চলেছে। আবার সেই সময় ঢাকা-কলকাতা বাস এবং ট্রেন যোগাযোগ শুরু হয়েছে। ফলে বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘সব যাবে সব যাবে’ এই ধরনের আশঙ্কা করার ঠিক হবে না। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির সম্পাদক প্রাক্তন আমলা অজয় দের মতে, আসলে বাজপেয়ির সঙ্গে মোদির তুলনা করা যাচ্ছে না এখন। কেননা মোদির মুখ্যমন্ত্রী চেহারা যেমন দেশবাসীর কাছে উজ্জ্বল। তবে মোদিকে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। বিজেপির মধ্যে যে বিভাজন রয়েছে সেই বিভাজনের চাপে এই কাজ করতে বাধ্য হবেন। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে বাজপেয়ির সময়ের থেকেই মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে কাজ দেখাতে হবে। কারণ মোদি নিজেই চাইবেন তিনি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে।
কলকাতার কবি বিপ্রতীপ দের মতে, বিজেপির উগ্রহিন্দুত্ববাদি রূপটি আসলে এখনও পরিষ্কার নয়। তবে যেই প্রধানমন্ত্রী হন বা যে দল-জোট দেশের ক্ষমতাভার গ্রহণ করুন না কেন ভারতের সংবিধান মেনে পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী প্রতিবেশী সব দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বিজেপি এলে যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকবে তাও সঠিক নয়।
লেখক:সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]
