নূর হোসেনের দুই পুকুরে রাখা হতো অস্ত্র, মাদক

আপডেট : ১০ মে ২০১৪, ২৩:২৮
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নূর হোসেনের কাঁচপুর শিমরাইল বাসভবনের সামনে ও পেছনে ২টি পুকুরে রাখা হতো ফেনসিডিল আর অস্ত্র। সীমান্ত থেকে সরাসরি কাভার্ড ভ্যান কিংবা ট্রাকযোগে ফেনসিডিল ও অস্ত্র নিয়মিত প্রতি রাতে উক্ত পুকুর পাড়ে এনে নামানো হতো। গভীর রাতে বস্তায় বস্তায় এসব ফেনসিডিল ও অস্ত্র পুকুরে রাখার দৃশ্য দেখতো এলাকাবাসী। গত শুক্রবার শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে নূর হোসেনের বিলাসবহুল অফিসে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩ হাজার বোতল ফেনসিডিল, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৭টি বিয়ার ও ৫টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর গতকাল শনিবার ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধি জানতে পারেন, প্রায় প্রতি রাতে কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক থেকে দুই পুকুরের পানিতে বস্তায় বস্তায় এসব ফেলতে দেখেছেন এলাকাবাসী। তারা জানান, এসব বস্তা একদল লোক পুকুর থেকে তুলে মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কারে ভর্তি করে নিয়ে যেতো প্রায় প্রতি রাতে। দূরে পুলিশ টহল ও এলাকাবাসীর চোখ এড়াতো না। অপরদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন এই নূর হোসেন তার পুত্র রাজিবকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। তার পুত্র রাজিবের অপরাধ ছিল পিতাকে না জানিয়ে বিয়ে করা। এমন নিষ্ঠুর ঘটনার বর্ণনা দেন নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ এলাকার এক বাসিন্দা। নূর হোসেনের এ নিষ্ঠুরতা ও মাদক ব্যবসা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য ঐ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি তার পাশ থেকে সরে পড়েন বলে জানান। পুলিশ, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা নূর হোসেনের কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা সম্পর্কে জানতো। নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে সর্বনাশা মাদকের বাণিজ্য নিরাপদ করতো নূর হোসেন। ১২ বছর ধরে নূর হোসেন সীমান্ত থেকে কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকযোগে কোটি কোটি টাকার মাদক এবং অস্ত্রের চালান আনতো শিমরাইলে। পুলিশ-র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার আস্তানায় অভিযান চালায়নি। ৪২টি স্থানীয় ও ঢাকার কয়েকটি মিডিয়ার সাংবাদিকদের প্রতিদিন টাকা ভর্তি ১৮০টি খাম উেকাচ দেয়া হতো। বাকি ১৩৮টি খাম যেতো পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তার পকেটে। এ কারণে তার মাদকের আস্তানায় পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত যাতায়াত করতো। এমন বর্ণনা দেন শিমরাইল এলাকাবাসী। নূর হোসেনের সিমরাইল বাসভবনে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার মূল মনিটর। এখানে বসে মাদক ও অস্ত্রসহ আন্ডার গ্র্যাউন্ডের সকল কার্যক্রম মনিটর করতো নূর হোসেন। ইতিমধ্যে পুলিশ তার বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি মাইক্রোবাস জব্দ ও ১১ জনকে আটক করে। ঐ দিনই ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থা রহস্যজনকভাবে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। ফলে সহজেই নূর হোসেনের ক্যাডার বাহিনী ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় ধারণকৃত মূল সফটওয়্যার সরিয়ে ফেলেছে। এ সুযোগ ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তারা করে দিয়েছেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। পুকুরসহ কোথায় কোথায় নূর হোসেন বস্তায় বস্তায় ফেনসিডিল ও অস্ত্রের চালান রাখতো সেই আস্তানা সম্পর্কে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবহিত। নজরুলসহ সাতজনকে হত্যা করার পর ঐ সব আস্তানায় অভিযান চালালে বস্তায় বস্তায় ফেনসিডিল ও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারতো পুলিশ। সেখান অভিযান পরিচালনা না করায় নূর হোসেনের ক্যাডাররা নিরাপদে ঐসব ফেনসিডিল ও অস্ত্র সরিয়ে ফেলতে সুযোগ পেয়েছে বলে এলাকাবাসীর জানান। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ঘটনার সময় তিনি নরসিংদীর পুলিশ সুপার ছিলেন। তিনি বদলি হয়ে নারায়ণগঞ্জে যোগদান করার পর নূর হোসেনের সম্ভাব্য সকল আস্তানায় অভিযান শুরু হয়েছে। পুত্র রাজিবকে যেভাবে হত্যা করে নূর হেসেন নূর হোসেন পুত্র রাজিব ভারতের একটি কলেজে পড়াশুনা করতো। খালাতো বোনের সঙ্গে রাজিবের প্রেম ছিল। পরে দুইজন গোপনে বিয়ে করে। এ বিষয়টি জেনে নূর হোসেন পুত্রের উপর ক্ষুব্ধ হয়। নূর হোসেনের দুই ঘনিষ্ঠজন বলেন, কৌশলে নূর হোসেন পুত্র ও বউকে বিয়ে মেনে নেয়ার কথা বলে সিমরাইলের বাসায় আসতে বলে। পিতার কথানুযায়ী রাজিব স্ত্রীকে নিয়ে ঐ বাসায় যায়। পাষণ্ড হূদয়ের অধিকারী নূর হোসেনের আসল চেহারা তখন দেখতে পায় সন্তান রাজিব। মুহূর্তের মধ্যে পুত্র রাজিবকে নূর হোসেন নির্দেশ দেয় যে, এখনই তালাক দিয়ে মেয়েকে খালার বাসায় পাঠিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় গায়েব হয়ে যাবে। পিতা নূর হোসেনের নির্মমতার কাছে পুত্র হার মেনে যায়। স্ত্রীকে তালাক দেয়।্ এরপর রাজিব হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত। প্রতিদিন পিতা নূর হোসেনের কাছ থেকে মাদকের জন্য ১০ হাজার টাকা নেয়। গত বছরের শেষদিকে নূর হোসেনের সিমরাইল মাদকের আস্তানায় ঢুকে পড়ে পুত্র রাজিব। সে তখন তার পিতার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনের চরিত্র দেখতে পায়। পুত্র রাজিবকে দেখে নূর হোসেন ক্ষিপ্ত হয়। সেখান থেকে পুত্র রাজিবকে বাসায় এনে নির্মমভাবে প্রহার করে নূর হেসেন। গত বছরের ৯ নভেম্বর রাজিব মারা যায়। নূর হোসেন তার পুত্র আত্মহত্যা করেছে বলে ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করেছে বলে ঐ দুই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি জানান। একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ বিষয় নূর হোসেন সহযোগিতা করেছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার জানান, নূর হোসেনের পুত্র রাজিবের মৃত্যুর বিষয়টি অনুসন্ধান করা হবে।