বৃদ্ধনিবাসে সন্তানের জন্য মায়ের অন্তহীন প্রতীক্ষা

আপডেট : ১০ মে ২০১৪, ২৩:৩৭
ছোট্ট একটি ঘর। আর একচিলতে ব্যালকনি। বাইরে উঁকি দেয়ার জন্য রয়েছে ছোট্ট একটি জানালা। এই হলো একজন বৃদ্ধ মায়ের জগত্। জীবন নিংড়ে যে নারী সমাজকে দিয়েছেন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, জীবন সায়াহ্নে সেই মায়েরা আজ চার দেয়ালের মাঝে বন্দী। নাড়িছেঁড়া ধন স্নেহের সন্তানরা আজ আর আসে না মাকে ভালোবাসা জানাতে। কোন সন্তান আজ তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে বলবে না ‘মা তোমাকে ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি’। কিন্তু তাতে কী? তবুও সন্তানদের জন্য সেই মায়েদের আশীর্বাদ ঝরছে বারংবার। এ বছর ৩০ জানুয়ারি রাতের আঁধারে কুমিল্লার ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মাকে ফেলে যান বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী বাসস্ট্যান্ডে। সংসারের বোঝা মনে করে গাড়িতে করে বৃদ্ধা মা আফলাতুন নেছাকে ফেলে যান তারই গর্ভের দুই সন্তান। বৃদ্ধা মা আটদিন শীতে কেঁপে, অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি অন্যত্র যেতে চাননি। কারণ তার সন্তানরা এসে যদি মাকে খোঁজে। বৃদ্ধা আফলাতুন নেছাকে হাসপাতালে নিলে চিকিত্সক জানান, নিজের ছেলে-মেয়েকে কাছে পেলেই তিনি মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠবেন। আফলাতুন নেছার মতো প্রতিটি মা তার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন সন্তানদের। আর সেই সন্তানরা বুঝে না বুঝে কতই না কষ্ট দেন মাকে। এমনি ক’জন মায়ের সঙ্গে কথা হয় আগারগাঁও বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের বৃদ্ধনিবাসে। প্রথমে তেমন কিছু বলতে না চাইলেও কথা বলার একপর্যায়ে ঝরে পড়ে তাদের অকৃত্রিম আবেগ। বলেন, ছেলে-মেয়ে নেই। কারো কাছে কিছু চাওয়াও নেই। যেটুকু দেবার দিয়েছি। এখন শুধুই বঞ্চনা। অসহায় এই মায়েদের একজন আয়েশা সিদ্দিকা। অসুখ আর বয়সের ভারে উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। ঘোলাটে চোখ দুটো কি যেন খুঁজে ফিরছে। টেবিলে পড়ে রয়েছে খাবারের বাটি, সেদিকে খেয়াল নেই তার। পেটে ক্ষুধা নেই, আছে অতৃপ্ত মনের ক্ষুধা..! বাকরুদ্ধ এই প্রবীণ কি যেন বলতে চান...! নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মা বলেন, মেয়ে-ছেলে সব আছে, একসময় ছেলে-মেয়েরা বাইরে থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরতো। এখন সব স্মৃতি...! তিনি রবীন্দ নাথের ভাষায় বলেন, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়, রইলো না/সেই যে আমার নানান রঙের দিনগুলি’। যে বয়সে এই মায়েদের ঘুরে-ফিরে আনন্দে থাকার কথা ছিল; সেই বয়সে তাদের থাকতে হচ্ছে আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে। খাবারটা এগিয়ে দেয়ার কেউ নেই। মনে সান্ত্বনা পাওয়ার মতো কোন কথা নেই। মনের দুঃখ-কষ্টের কথা খুলে বলার মানুষ নেই। বুকের হাহাকার মেটানোর জন্যে কাউকে বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ নেই। এতো সব নেই মিলে হতাশা আর অসহায়ত্ব ঘিরে ধরেছে তাদের। বলেন, কখনো ভাবিনি শেষজীবনে আমার আদরের সন্তানটিকে জড়িয়ে ধরতে পারবো না। বছরের পর বছর তারা রয়েছেন এই সংঘের চার দেয়ালের ভিতরে। ঘরে টেলিভিশন আছে, ছোট্ট শো-কেসটাতে সযতনে সাজিয়ে রেখেছেন ছেলে-মেয়ে আর স্বামীর ছবি। এখন সবই অতীত। কয়েক যুগের সঙ্গী স্বামী চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ছেলে-মেয়েরাও হয়েছে দূর দেশের বাসিন্দা। ছবির সঙ্গে কথা বলে আর ছবির সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দিন কাটে প্রবীণ মায়েদের। মীরা চৌধুরী বলেন, একসময় সব ছিল! এখন কিছু নেই। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার একটিমাত্র ভাইয়া ছিল, গত পরশুদিন তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে, ভাইয়া বলেছিল, এসে আমাকে নিয়ে যাবে, আমার চিকিত্সা করাবে...! কিন্তু তার পরদিনই ভাইয়া হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আমার আর কেউ নেই....! বলে কাঁদতে থাকেন তিনি। ৭২ বছর বয়সী প্রবীণ মাসুমা সিদ্দিকী। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে তিনি এখন একলা পথের পথিক। ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী সব আছে তার। কিন্তু তাকে দেখভাল করার সময় নেই তাদের। অনেক অসুখ ঘিরে ধরেছে তাকে। তারপরও হাসি-খুশি মাসুমা সিদ্দিকী বলেন, দুটি কিডনী নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তার সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস করাতে বলেছেন, কিন্তু এতো টাকা নেই। তবে আরো কিছুটা দিন বেঁচে থাকার আশায় বুক বেঁধে আছেন তিনি। বিত্তবান ও হূদয়বানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বলেন, কোন পুত্র-কন্যা যদি এই দায়িত্ব নেন তাহলে কিছুটা দিন বেঁচে থাকার সুযোগ হয়তো পাবো! প্রবীণ হিতৈষী সংঘের কর্মী ফেরদৌস আরা বলেন, আপনজনদের কাছ থেকে দূরে এসে এখানে কেউ ভালো থাকেন না। এদের সবারই মানসিক অবস্থা একেবারেই স্পর্শকাতর। সামান্য কথাতেই অভিমান করেন, আবার একটু আদর করলেই ভালো হয়ে যান। এসব প্রবীণের যেটা অভাব, তা হচ্ছে আপনজনদের ভালোবাসা, যা আমরা চাইলেও দিতে পারি না।