নাচ হচ্ছে পারফর্মিং আর্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন, মোহনীয় আর্ট; যা মানুষকে ছুঁয়ে যায় সহজে। মানুষের সহজাত এই প্রবৃত্তি সব দেশের প্রায় সব সংস্কৃতি ও কৃষ্টিতে বিদ্যমান। কখনও কখনও নাচ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, প্রেম-ভালোবাসার ভাষা, রাগ-অনুরাগের ভাষা। ‘চিত্ত মম বিকশিত হোক নৃত্যের তালে তালে’ স্লোগানে গত ২৯ এপ্রিল নৃত্যশিল্পীদের সবচেয়ে বড় এ উত্সব বিশ্ব নৃত্য দিবস পালিত হয়। এই দিনটিতে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের এবারের আয়োজন প্রজন্মের মেধাবী কয়েকজন নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে। যাদের মেধা, পরিশ্রম, আত্মনিয়োগ শিল্পের এই অনন্য ক্ষেত্রটিকে করেছে আরও বেশি সমৃদ্ধ। আয়োজনটি সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার গ্র্রন্থনা করেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র,
আহসান রনি ও ইশরাত বিনতে আফতাব
লু ব না মা রি য়া ম
কৈশোরেই তিনি দেখেন উত্তাল এক সময়—জাতিসত্তার লড়াইয়ে আত্মপ্রত্যয়ী বাঙালির জেগে ওঠা আর সেই সঙ্গে অপূর্ব এক সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ। তখন বড় সংগঠনের মধ্যে বাফা, ছায়ানট উল্লেখযোগ্য ছিল। ছোট ছোট সংগঠন ছিল তারা সংস্কৃতিচর্চা করত। তিনি লুবনা মারিয়াম বাংলাদেশের স্বনামধন্য এক নৃত্যশিল্পী। আপাদমস্তক এই শিল্পী সম্প্রতি পেয়েছেন প্রথম বিশ্বরত্ন ভূপেন হাজারিকা আন্তর্জাতিক সংহতি পুরস্কার। তার সংস্কৃতের ওপর অসামান্য দখল ও পাণ্ডিত্য, নৃত্য নিয়ে নিরলস কাজ, রবীন্দ্রচর্চা, বাংলাদেশের লোকনৃত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করানো এবং বহুমুখী কাজই তাকে এনে দিয়েছে সম্মানজনক এ পুরস্কার।
৬-৭ বছর বয়স থেকেই মঞ্চে কাজ করা শুরু করেন। বাফার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। ’৭৩ সাল থেকে শুরু করেন স্বতন্ত্রভাবে কাজ করা। ’৭২ থেকে ’৮২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর, কলকাতায় বিশ্বভারতী আশ্রমিক সংঘের সঙ্গে অনেক কাজ করেছেন। পরিচিত হয়েছেন বিশ্বভারতীয় রবীন্দ্র নৃত্যের সঙ্গে। গায়িকা কণিকা বন্দোপাদ্যায়, নীলিমা সেন গান করেছেন তার সঙ্গে তিনি নৃত্য করেছেন। শান্তিবালা সিনহার কাছে তিনি শিখেছেন মণিপুরী নাচ। ’৮৪ থেকে কর্পোরেট অফিসে যোগ দেওয়াতে নাচ থেকে একটু সরে আসতে হলো তাকে। সেসময় মেয়ে আনুশেহ্ আনাদিল বড় হতে থাকল।
’৯১-এর দিকে ‘সাধনা’ শুরু করেন। এটি একটি ট্রাস্ট। প্রথম দিকে সাধনার লক্ষ্য ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সাধনা থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি নাচের অনুষ্ঠান প্রযোজনা শুরু করা হয়। শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন না, নিজেরা কিছু করবেন—এ ভাবনা থেকেই প্রযোজনার শুরু। ভারতে পড়াশোনা করে ফিরে এসে দেখেন নাচ নিয়ে অনেক কাজ বাকি। তখন ‘ভানুসিংহের পদাবলী’, ‘বাদল বরিষণে’-এর মতো নৃত্যনাট্য প্রযোজনা করেন। ২০১০ থেকে শুরু করেছেন পারফর্মিং আর্টের স্কুল কল্পতরু। এ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন তিনি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বাংলাদেশের লোকগীত, নৃত্য নন্দনতত্ত্ব, লোকনৃত্য, সংস্কৃত, পারফর্মেন্স, কালচারাল স্টাডিজ এবং নানাবিধ বিষয়ে দেশে বিদেশে অসংখ্য পেপার উপস্থাপন করেন। লিখেছেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রবন্ধ। নাচ নিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল, গ্যাটে ইনস্টিটিউট, আমেরিকান সেন্টারের সঙ্গে কাজ করছেন। কোরিয়াতে গোয়াংজু নামে একটা জায়গা স্থাপন করা হচ্ছে। সেটাকে কোরিয়ার সরকার এশিয়ার সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। তাদের সঙ্গে মনসা নিয়ে একটা গবেষণার কাজ করছেন লুবনা। লাঠি খেলা বা বায়বেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তার এই সৃষ্টিশীল কাজ, মঞ্চে নিজেকে উপস্থাপন আর রস সৃষ্টি সবকিছুর মধ্যে একটা আধ্যাত্মিকতার যোগসূত্র খুঁজে পান মারিয়াম। সকল কাজ আর সৃষ্টির প্রেরণাও মনে করেন তা-ই। তার মতে, এ উপমহাদেশের শিল্পশাস্ত্র, রসতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব—সবগুলোর মূল লক্ষ্য আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ। রসশাস্ত্রে বলা হয়, মঞ্চে যে ভাব, অনুভব, রস ইত্যাদি সৃষ্টি হয় তা সবটাই অলৌকিক, অর্থাত্ লৌকিক নয়। সামনে এক অপার সম্ভাবনাময় সময়কে অবলোকন করেন লুবনা মারিয়াম। তার বিশ্বাস অনেকদূর যাবে এ দেশের নাচ। সামনের সময়টা হবে আরও সৃষ্টির আরও প্রাপ্তির।
লুবনা মারিয়াম
ডাকনাম :লুবনা
জন্ম তারিখ ও স্থান :৮ জুলাই, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে
মায়ের নাম :প্রফেসর এমিরাটাস ড. সুলতানা সারওয়াত্
বাবার নাম :বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান
প্রথম স্কুল :ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
প্রিয় উক্তি :তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ ধনম্\ অর্থ :ত্যাগের সহিত ভোগ করিবে; কাহারও ধনে লোভ করিও না।
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা
প্রিয় পোশাক :শাড়ি
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :আত্মা থেকে পরমাত্নাকে উপলব্ধি করা, সুখ নয় আনন্দ লাভ করা!
====
মু ন মু ন আ হ মে দ
প্রথম যেবার মঞ্চে নাচতে উঠেছিলেন সেবার না নেচে নখ খুটাতে থাকেন। দর্শকরা সবাই চিত্কার করতে নাচতে বলে। কিন্তু ৫ বছরের মুনমুন সেদিন মঞ্চে উঠে নাচতে পারেননি। গুরু আজহার আলী খান এসে বললেন, ‘আজ মেয়ে মঞ্চে দাঁড়ানো শিখল, পরে নাচবে।’ সেই ছোটবেলাতেই মা তাকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন নাচের স্কুলে। সেখানে খুব ভালো করলেও প্রথমদিন মঞ্চে উঠে কিছু দেখাতে পারেননি। গুরুর কাছে তারপরও নাচ শেখা চলতে থাকে। তিনি নাচ শেখেন হাবিবুল চৌধুরী, সালেহা চৌধুরী ও সৈয়দ আবুল কালাম তাকে কত্থক শেখান নিজের শিষ্য হিসেবে। শেখা শুরু করার পর মনে হতে থাকে যেন নতুন একটা জগতে প্রবেশ করলেন। ভালোবাসা জন্মে গেল নাচের প্রতি। আত্মীয়দের অনেকে পছন্দ করতেন না সেই সময়ে কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে ছাড়েননি তিনি। বরাবর স্বাধীনচেতা মুনমুন শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও অনেক গুরুর কাছে নাচ শিখে নিজের প্রতিভাকে শানিত করেছেন। শিশুশিল্পী হিসেবেই জাতীয় টেলিভিশনে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী নির্বাচিত হয়েছেন ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। ভারতে থেকে তিনি নাচের উপর অনার্স, মাস্টার্স ও ফেলোশিপ করেছেন। নিজের অতি প্রিয় নাচ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন, ‘৬৪ কলার দ্বিতীয় কলা হচ্ছে নৃত্য। নাচ হচ্ছে এমন একটি শিল্প বা ভাষা যা দ্বারা মনের সব অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা যায়। মঞ্চকে আমরা একটি ক্যানভাস কল্পনা করে সেই ক্যানভাসে নিজেকে আঁকতে থাকি। হাত, পা, মুখসহ শরীরের সকল অঙ্গ দিয়ে আমরা প্রকাশ করি অনুভূতি, কোনো ঘটনা বা কোনো নাটক।’ এটির জন্য যেমন ভালো কোনো গুরুর কাছে শেখার দরকার আছে, তেমনি পর্যাপ্ত শেখারও অনেক দরকার। কিন্তু তিনি হতাশা জানালেন বর্তমান নবীনদের কর্মকাণ্ডে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ না শিখেই প্রতিযোগিতায় যায় বা কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফেলে। তবে এর জন্য তিনি মিডিয়াকেও দোষ দেন। মিডিয়া তাদের প্রচারের জন্য যথেচ্ছভাবে নাচকেও প্রচার করছে, এতে নাচ শেখার প্রতি এখনকার তরুণরা বেশি আগ্রহ দেখায় না। তিনি বলেন, ‘বর্তমানের প্রজন্ম নাচ শেখার চেয়ে যোগাযোগ বেশি শেখে। তারা কীভাবে কোথায় কাজ করার সুযোগ পাবে সেই আশায় বসে থাকে। কিন্তু আমি তাদেরকে শেখার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেবো। কারণ নাচ একটি শিল্প এবং এই শিল্পকে না শিখেই এর যথেচ্ছ ব্যবহার করা উচিত নয়।’ তিনি নতুন প্রজন্মকে কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমে নাচ শিখে তারপর বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার পরামর্শ দেন। তিনি নিজেও চেষ্টা করে যাচ্ছেন ভালো কিছু নৃত্যশিল্পী তৈরি করার লক্ষ্যে। তিনি নিজের কিছু প্রতিনিধি তৈরি করতে চান, যারা নাচ শিখবে এবং চর্চার মাধ্যমে এই শিল্পটিকে আরও উন্নত করে তুলবে। রেওয়াজ পারফরম্যার্স স্কুল—নামে তার এই নাচের পাঠাগারে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য।
মুনমুন আহমেদ
ডাকনাম :মুনমুন
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৭ অক্টোবর, আজিমপুর, ঢাকা
মায়ের নাম :সালেহা বেগম
বাবার নাম :রফি আহমেদ
প্রথম স্কুল :মিরপুর বাংলা স্কুল
প্রিয় মানুষ :মা, মেয়ে, স্বামী, গুরু পণ্ডিত বিরজু মহারাজ
প্রিয় উক্তি :শান্তি চাই
প্রিয় পোশাক :শাড়ি
অবসর কাটে যেভাবে :অবসর পান না, তবে যা পান বাড়ির কাজে ব্যয় করেন।
সাফল্যের সংজ্ঞা :কঠোর পরিশ্রম।
=========
সো হে ল আ হ মে দ
তার মা একবার বাবার কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমার একজোড়া স্বর্ণের চুড়ি কেনার দরকার।’ বাবা টাকা দিলেন। মা সেই টাকা দিয়ে টেপরেকর্ডার কিনে আনলেন। কারণ তিনি ছেলেকে নাচ শেখাতে চান। বাবা দেখে অনেক রাগ করলে মা তাকে বোঝালেন তিনি পরবর্তীতে এই গহনার জন্য আর কখনও বলবেন না। বাবা অনেক ধমকও তার মাকে টলাতে পারেনি। সোহেলের মায়ের অনেক কম বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে তিনি নিজের নাচ শেখাটা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তাই নিজের সন্তানের মাধ্যমেই নিজের স্বপ্নপূরণ করতে চেয়েছেন। নিজের চার ছেলের সবাইকে তিনি নাচ শেখানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু প্রথম তিনজন আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু সবার ছোট সোহেলের নাচের প্রতি আগ্রহের সীমা ছিল না। মা যখন তাকে নাচ দেখাতেন তিনি হাততালি দিতেন, হাসতেন, মজা পেতেন। এই আগ্রহ দেখে সোহেলের মা সোহেলকে নাচ শেখাতে শুরু করেন। ১২ বছর পর্যন্ত মা শেখালেও ঢাকায় আসার পর মা সোহেলকে ভর্তি করিয়ে দেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। সেখানে রাহিজা খানম ঝুনু তাকে কত্থক ও সাধারণ নৃত্য শেখাতে থাকেন। নাচিয়ে সোহেলকে দেখে তিনি মুগ্ধ হন। তিনি আলাদাভাবে সোহেলকে নাচ শেখাতে থাকেন। সেখানে তিনি সার্টিফিকেট কোর্স শেষ করেন। এরপর রাহিজা খানম ঝুনুই তাকে অন্যদের নাচ শেখানোর দায়িত্ব দেন। এমন হয়েছে তিনি তার থেকে বেশি বয়স্কদেরকে নাচ শিখিয়েছেন। নতুন কুড়িতে গেলে সেখানে তার নাচ দেখে বিচারক লায়লা হাসান মুগ্ধ হন। তিনিও সোহেলকে নাচ শেখাতে থাকেন। রায়ের বাজারে বেড়ে ওঠা সোহেলের নাচই জীবন। তিনি বলেন, ‘নাচ এমন একটি শিক্ষা, যা অর্জন করলে একজন মানুষ সংস্কৃতির সবশাখায় ভালো করতে পারবে, সফলতা অর্জন করতে পারবে। কারণ নাচ শেখা মানেই এক্সপ্রেশন দিতে শেখা, গানের তাল-লয় শেখা, নিজেকে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে শেখা।’ তিনি নাচ করেছেন ডলি ইকবাল, লোপা চৌধুরী, শাওন মোস্তফা ও শামীম আরা নীপার সঙ্গে। পরবর্তীতে মৌ, রিয়া, সাবা ও শখের সাথেও তার জুটি জনপ্রিয় হয়েছে। তিনি এখন বুলবুল ললিতকলা একাডেমির নৃত্য শিক্ষক। তিনি ধারণ করছেন নৃত্যকে। এখনও তিনি নাচ করে চলেছেন। তিনি নিজে নাচের জন্য অনেক কিছু করেছেন, তিনি তরুণ প্রজন্মের নাচ দেখে হতাশ। কারণ তাদের সময়ে তারা যেমন নাচ শিখেছেন এখনকার তরুণরা সেভাবে নাচ শিখছে না। তারা অল্পতেই সফলতা পেতে চায়। অল্প কিছু শিখে তারা অনেক কিছু পাওয়ার আশা করে ফলে তারা খুব তাড়াতাড়ি ঝরেও পড়ে। সোহেলের মতে, ‘এখন নতুন নৃত্যশিল্পীদের খোঁজার জন্য রিয়েলিটি শো হচ্ছে। কিন্তু আমরা কারো মধ্যে আমাদের নিজেদের ছায়া দেখতে পাই না। তারা শেখার চেয়ে নিজেকে প্রেজেন্ট করার উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’ তিনি আশা করেন, তরুণ প্রজন্মের যারা নাচ শিখছে তারা ভালোভাবে নাচ শেখার পর এই পেশায় যুক্ত হবে। অল্প শিখে অনেক ফলাফল পাওয়ার আশা করবে না। তারা অনুশীলন ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদেরকে একজন প্রকৃত নৃত্যশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলবে। তিনি অপেক্ষায় আছেন এমন কিছু নৃত্যশিল্পীর যারা নাচকে নিজের সত্তার মধ্যে ধারণ করে, নাচ অন্তপ্রাণ হয়ে বাংলাদেশে নৃত্যশিল্পটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সোহেল আহমেদ
ডাকনাম :সোহেল
জন্ম তারিখ ও স্থান :১৮ আগস্ট ও খুলনার বাগেরহাট
মায়ের নাম :মীনা রহমান
বাবার নাম :মতিউর রহমান
প্রথম স্কুল :কিশোরগঞ্জের কিন্ডার গার্টেন
প্রিয় মানুষ :হযরত মুহাম্মদ (স.) ও মা
প্রিয় উক্তি :সদা সত্য কথা বলিবে।
প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, জিন্স
অবসর কাটে যেভাবে :প্রিয় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, টিভি দেখে, গান শুনে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট করে সেটি অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যে ফল পাওয়া যায় সেটিই সফলতা।
=======
শি ব লী মো হা ম্ম দ
শিবলী মোহাম্মদ, বাংলাদেশের অত্যন্ত স্বনামধন্য একজন নৃত্যশিল্পী। ছোটবেলা থেকে যদিও নৃত্যশিল্পী হওয়ার মতো কোনো ধরনের আভাসই ছিল না কিন্তু নিজের প্রতিভার জোরে অজান্তেই চলে এলেন শিল্পের রাস্তায়। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। আর দশজনের মতোই স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। যদিও বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সাদি মোহাম্মদের ভাই শিবলীর রক্তেই ছিল শিল্পের বীজ। আর ছোটবেলা থেকেই নাচ দেখতে খুব পছন্দ করতেন তিনি। টিভিতে নিয়মিত নাচ দেখতেন এবং এর কারণেই হয়তো নাচের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা গড়ে ওঠে তার মধ্যে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর নাচ শেখা শুরু করেন তিনি। প্রথমে বাংলাদেশে। পরবর্তীতে দিল্লিতে আর তারপর লাখ্নৌতে গুরু বিরজু মহারাজের কাছে নাচ শেখা তার। শিবলীর মতে যেকোনো ধরনের শিল্পের জন্য, বিশেষত নাচের ক্ষেত্রে একজন গুরু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিরজু মহারাজের প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন প্রথম বাংলাদেশি ছাত্র। আর সন্দেহাতীতভাবেই মহারাজের প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত প্রতিভাবান এবং অধ্যবসায়ী ছাত্র ছিলেন যা মহারাজ নিজেই স্বীকার করেন। তার কাছে বেড়ে ওঠার গল্প জানতে চাইলে বলেন, ‘আমরা ৬ ভাই, ৪ বোন। জীবনের কঠিন সময়ের মধ্যেই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মুক্তিযুদ্ধে বাবার শহীদ হওয়া। এরপর আমাদের পরিবারে কিছুটা আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। সেজন্য মা চাকরি করা শুরু করেন। আমার ভাইরাও ছিলেন মাথার উপর অভিভাবকের মতো। শৈশবে আনন্দের স্মৃতি যা আছে তার অধিকাংশই পরিবারকে ঘিরে।’ নাচকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেবেন এটা চিন্তা করার পর পরিবারের সবার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল জানতে চাইলে বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে তিনি জানান, ‘জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে পড়াশোনা শেষ করে যখন নাচ নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করব বলে চিন্তা করি তখনও পরিবারের কেউ তেমন একটা বাধা দেয়নি। যদিও নাচকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়া তো দূরের কথা, নাচ শেখাকেই তখন পর্যন্ত নেতিবাচক চোখে দেখা হতো। পরিবারের সবার সমর্থন থাকলেও অনেক আত্মীয় অথবা কাছের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিন্দা করেছেন আমার এই সিদ্ধান্তের। অনেকেই বলেছেন, এমনিতেই নাচ শিখে ভবিষ্যতে কিছু করা যাবে না তার উপর ছেলে মানুষ নাচ শিখে কী করবে। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। তাই এখন তাদের আনেকেই নিজেদেরকে আমার পরিবারের মানুষ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে।’ নাচের ক্যারিয়ারে প্রথম সুযোগ পান, ভারত থেকে আসা জিতেন সিংয়ের ব্যবস্থাপনায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠানে। প্রথম নাচ হলেও অনেক দেশবরেণ্য মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছেন শিবলী মোহাম্মদ। এরপর থেকেই তাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং এরপর আর পেছন ফিরে তাকানো হয়নি তার। যদিও একজন পুরুষ নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে কিছুটা কষ্ট হয়েছে কিন্তু তিনি নিজের প্রতিভা এবং নাচের প্রতি ভালোবাসার উপর অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে তার ভাবনা কী জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। নাচের প্রতি আগ্রহী এ রকম অনেক তরুণকে তিনি দেখেছেন। নাচকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন শুধু তরুণরাই না তাদের পরিবারও এগিয়ে আসছে। তাদের পারফর্মেন্সও অত্যন্ত ভালো।’ এখন পর্যন্ত তার অর্জন কী জানতে চাইলে তিনি বলেন তার কাছে পুরস্কারের চেয়ে বড় অর্জন তার নিজের প্রতিভাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাওয়া। তিনি পৃথিবীর দূর-দূরান্তে যেখানেই গিয়েছেন অন্তত একটি পরিবার পেয়েছেন যে তার ছাত্র ছিল। এটাই তার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আর নাচকে কেন শিল্প হিসেবে মনে করা হয় তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নাচ হচ্ছে সকল শিল্পের জননী। কারণ এটিই একমাত্র মাধ্যম যার কোনো ভাষার প্রয়োজন নেই। শুধু অঙ্গভঙ্গি দিয়েই নিজের মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। নাচ নিয়ে আরও অনেকদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তরুণ প্রজন্মকে নিয়েও তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। খুব শীঘ্রই বাংলাদেশকে বিশ্বের দুয়ারে পৌঁছে দেবে তারা নাচের মাধ্যমে বলে তিনি মনে করেন।
শিবলী মোহাম্মদ
ডাকনাম :শিবলী
জন্ম তারিখ ও স্থান :৪ এপ্রিল, ঢাকা
বাবার নাম :শহীদ সলিমুল্লাহ
মায়ের নাম :জেবুন্নেসা বেগম
প্রথম স্কুল :মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল
প্রিয় ব্যক্তিত্ব :মা
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়া, গান শোনা
========
লি খ ন রা য়
ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছেন তিনি। কিন্তু লিখনের তিন দিদি তাকে বড় করে তুলেছেন নিজেদের সন্তানের মতো করে। অনেক ভালোবাসার মধ্যে বড় করে তুলেছেন তাকে। ছোটবেলায় লিখন টিভিতে শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নিপার নাচ দেখতে খুব ভালোবাসতেন। তাদের নাচ এতই ভালো লাগত যে একসময় তিনি দিদিদের কাছে আবদার করলেন নাচ শেখার। দিদিরা সবসময় ছোট ভাইটির ইচ্ছাগুলো পূরণ করেছেন। এবারও ব্যতিক্রম হলো না। দিদিরা লিখনকে ভর্তি করে দিলেন নাচের স্কুলে। এরপর লিখন গুরু কবিরুল ইসলাম রতন, শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নিপার সহায়তায় নিজেকে গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন। শিখতে থাকেন নাচের নানা মুদ্রা। পলিটেকনিক গভ. বয়েজ ও বিজ্ঞান কলেজ থেকে পড়াশোনার পর ভারত সরকারের বৃত্তিতে ১৯৯৯ সালে দিল্লিতে যান নাচ শিখতে। সেখান থেকেই নাচের উপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন তিনি। এরপর বাংলাদেশে এসে নানা অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতে থাকেন। নিজের গুরুদের সংস্পর্শে ছিলেন সবসময়। তারাই যেহেতু নাচের দিক দিয়ে বাংলাদেশে সেরা আর তার পারফর্মেন্সে সবাই মুগ্ধ ছিলেন তাই কাজের অভাব হয়নি তার। নিজেকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে। ফলে সবাই তার নাচ পছন্দ করতে শুরু করেন। নানাজনের সাথে নাচ করতে করতে একসময় নাদিয়ার সাথে তার নাচ দেখে সবাই পছন্দ করতে শুরু করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদেরকে জুটি হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন অনেকে। ফলে লিখন-নাদিয়া জুটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারা নাচের মধ্যে এক নতুন আধুনিক ধারা নিয়ে আসেন। যা তাদেরকে সকলের পছন্দের তালিকার শীর্ষে নিয়ে আসে। তিনি জানালেন, তাদের সময় যারা নাচ শিখতেন তারা নাচের প্রতি অন্তঃপ্রাণ ছিলেন। সেই সময়কার নৃত্যশিল্পীরা নাচকে একটি শিল্প হিসেবে দেখতেন এবং নিজে সেই শিল্প শেখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। তারা নাচকে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। কিন্তু বর্তমানে যারা নাচে আসছে তাদের বেশিরভাগ স্টার হওয়ার জন্য আসছে। কিন্তু তিনি মনে করেন, স্টার হওয়ার জন্য যারা নাচ শেখে তার খুব তাড়াতাড়ি ঝরে পড়ে। তাই তিনি প্রজন্মকে নাচকে শিখে, অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তারপর নাচের পরামর্শ দেন। জোয়ারে গা না ভাসিয়ে নাচ শেখার প্রতি মননিবেশ করার পরামর্শ দেন তিনি। লিখনের মতে, সাধনার মাধ্যমে এবং সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি বা কোনো কিছুকে প্রকাশ করতে পারার কারণে নৃত্যকে আমরা একটি শিল্প হিসেবে জানি। এই শিল্পের পূজারী থাকতে চান আজীবন, এমনটাই জানালেন প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় এই নৃত্যশিল্পী।
লিখন রায়
ডাকনাম :লিখন
জন্ম তারিখ ও স্থান :৯ অক্টোবর, রংপুর
মায়ের নাম :সুধা রায়
বাবার নাম :গঙ্গাধর রায়
প্রথম স্কুল :বিন্দুবাসিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :দিদি শেফালী রায়, গৌরী রায় ও মন্জু রায়
প্রিয় উক্তি :মানবতাই ধর্ম
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :ঘুমিয়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রমই সাফল্যের মূলমন্ত্র।
