স্থাপনার কবি

আপডেট : ১১ মে ২০১৪, ১৯:৪৭
গত দুই দশকে আমাদের দেশীয় স্থাপত্যে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। ঢাকার বুকেই অনেক আকাশ সমান আধুনিক স্থাপনার ভিত্তি রচনা করে জানান দিয়েছি, আমরা চাইলেই পারি। এই এক একটি স্থাপনা যেন ইট, কাঠ আর কনক্রিটের এক-একটি গল্প। আর শুধুই তো উঁচু উঁচু ভবন নয়, স্থাপনা কখনও শিল্পের পর্যায়ে যেতে পারে। মুস্তাফা খালিদ পলাশ মূলত একজন শিল্পী, আজন্ম চেয়েছিলেন শিল্পী হবেন, রংতুলিতেই জড়িয়ে আছে তার এই সার্থক জনমের অনেকটা সময়। কাজেই তার স্থাপনাতেও তিনি শিল্পকে খুঁজে ফেরেন, চর্চা করে যাচ্ছেন শৈল্পিক সব স্থাপত্য প্রণয়নের। ভিসতারা আর্কিটেক্টসের প্রধান মুস্তাফা খালিদ পলাশ আমাদের আজকের প্রজন্ম প্রতিনিধি, তার সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ছোট্ট এক অফিস তখন গুলশানে, স্থাপত্যচর্চায় মনোনিবেশের চেষ্টা! বেশ কিছু প্রজেক্ট তখন চলমান, কিছু নিয়ে চলছে পরিকল্পনা। একদিন সেই অফিসে হাজির দেশের অন্যতম শীর্ষ এক উদ্যোক্তা, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান! তারা গড়তে চান এমন এক বিপণী বিতান, যা কি না শুধু দেশেই নয়, এই উপমহাদেশেই হবে অনন্য। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের, কর্মক্ষেত্রে নবীন সেই স্থপতিতের নকশাতেই প্রণীত হলো দেশসেরা এই বিপণী বিতান, বিশ্বের আধুনিক সব প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে এখানে, নগরের মাঝেই এ যেন অন্য এক নগরী। ঢাকার যান্ত্রিক নাগরিকদের মাঝে এর প্রভাব আজ কতদূর, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলছিলেন তার স্থাপত্যচর্চার শুরুর দিককার কথা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেই নিজেই কিছু করার উদ্যোগ নিলেন। প্রস্তুতি লিমিটেড নামে তিনি নিজের ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন, স্বল্প কিছু কাজ দিয়ে হলেও তিনি নজর কেড়েছিলেন সেই সময়ে, তবে দেশীয় সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থাপত্যচর্চা ততটা অনুকূলে ছিল না সেই সময়ে। তিন-চার বছর তবুও তিনি হাল ছাড়েননি, চেষ্টা করে গেছেন স্থাপত্যে নতুন কিছু করা যায় কি না। শেষটায় তিনি ‘প্রস্তুতি’ ছেড়ে যোগ দিলেন ‘প্রস্থাপনা’-তে, একজন পরামর্শক স্থপতি হিসেবে। ততদিনে নিজের ভালোবাসার মানুষ স্থপতি শাহজিয়া ইসলাম অন্তনের সাথে পারিবারিক বন্ধনও হয়ে গেছে, ঘর আলো করে এসেছে প্রথম সন্তান নৈঋত। প্রস্থাপনাতেও হতে পারত সফল ক্যারিয়ার, সেই সময়েই আমন্ত্রণ পান নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে। বুয়েটে যোগ দিলেন প্রভাষক হিসেবে। ব্যবহারিক চর্চার চেয়ে নবীন স্থপতিদের নিত্যনতুন ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার অন্যরকম এক অভিজ্ঞতায় পার করলেন কয়েকটা বছর। সহকর্মী অনুজ স্থপতি ফয়েজ উল্লাহকে নিয়েই তখন তারা ভাবলেন, কেন আমাদের আধুনিক স্থাপনার চর্চা নিজেদের পাঠ্যের মাঝেই থাকবে? কেন তার প্রতিফলন হবে না এই শহরে? এই চিন্তাভাবনার আলোকেই বেশকিছু প্রজেক্ট হাতে নিলেন তারা। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ফয়েজ উল্লাহ ভিসতারার সাথেই ছিলেন। যাই হোক যাত্রা শুরু হলো আজকের প্রতিষ্ঠিত ভিসতারা আর্কিটেকটসের, সাথে ছিলেন সহধর্মিণী স্থপতি অন্তন। বুয়েটের শিক্ষকতা তখনও চলছে, যদিও অন্তন পুরোপুরি নেমে গেছেন স্থাপত্যচর্চায়। রূপারূপ অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের জন্য বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট থেকে আইএবি ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড পান তারা। ততদিনে শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করলেন পরামর্শক হিসেবে। ইউনিক ট্রেড সেন্টারও তৈরি হয় তাদের হাত ধরে। ১৯৯৭ সালে এই ধরনের একটি স্থাপনা তাদের জন্য নতুন অনেক কিছুই ছিল তা বলা বাহুল্য। এর ধারাবাহিকতায় এবং বলা যায় ইউনিক ট্রেড সেন্টারের কাজের পসরা দেখেই মুগ্ধ হয়ে নবীন এই স্থপতিদের হাতে এসেছিল বসুন্ধরা সিটির দায়িত্ব। জানিয়ে দিই, এর আগেই কিন্তু বিশ্ববরেণ্য স্থপতি তাদাও আন্দোর কাছে জাপানে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন মুস্তাফা খালিদ পলাশ। তার সরল নকশা করার ভঙ্গি অথবা প্রযুক্তির সমন্বয় তার কাজের মাঝেও প্রভাব ফেলে। নিজের দর্শনের উল্লেখ করতে গিয়েও মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, তিনি চান ডিজাইনে একটা সহজ সরল ভঙ্গি থাকবে। বাহুল্য বর্জন করেন তিনি! তারচেয়ে বড় বিষয় তিনি সত্যকে প্রকাশ করতে চান তার নকশাতে, আর সত্যর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে? দিব্যি ইট, কনক্রিট আর গ্লাসেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বিশাল সব স্থাপনা, এখানে অহেতুক আদিখ্যেতার কোনো সুযোগ নেই, সুন্দর একটা পরিসর তৈরি করে দেওয়াই তার লক্ষ্য থাকে। সেটা যতটা না চোখে দেখার, তার চেয়ে বেশি উপলব্ধি করার মতো সৌন্দর্য। স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ ও তার ফার্ম ভিসতারা এরপর আরও অনেক স্থাপনায় নিজেদের কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। ২০০৫ সালে গ্রামীণফোনের হেডকোয়ার্টার নির্মাণের জন্য আহুত প্রতিযোগিতায় বিশ্ববরেণ্য অনেক ফার্মকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হন তারা। এরপর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নির্মিত হয় সুবিশাল এই কর্পোরেট অফিস। আরেক টেলিকম সেবাদাতা বাংলালিংকের হেডকোয়ার্টারও তার নকশায় প্রণীত, দ্য ওয়েস্টিন ঢাকার কাজটা আরও আগেই করা তাদের, এখন শেষের পথে দেশের সবচেয়ে বড় পাঁচতারা হোটেলের স্বীকৃতি পেতে যাওয়া চট্টগ্রাম র্যাডিসন, শান্তা ওয়েস্টার্ন টাওয়ার, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটাল, মোনেম বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট, উত্তরার আরএকে টাওয়ার, সিয়াম টাওয়ার, পিপলস ইন্স্যুরেন্স ভবন, সোনারগাঁয়ের জাদুঘর কমপ্লেক্সের মতো পরিচিত অনেক আধুনিকধারার স্থাপত্যের সাথে জড়িয়ে আছে ভিসতারা আর মুস্তাফা খালিদ পলাশের নাম। স্বীকৃতি কাজের মান বাড়ায়, ২০০৭ সালে ‘বার্জার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন আর্কিটেকচার’ পান তিনি। ভারত থেকে ২০০৩ সালে ‘আর্কিটেক্টস অব দ্য ইয়ার’ পদক পান খ্যাতিমান এই স্থপতি। এর বাইরে তার অসংখ্য স্বীকৃতি রয়েছে স্থাপনা ও চিত্রকলায়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত স্থপতি ফয়েজ উল্লাহর সাথে যৌথভাবেই কাজ করেন, পরবর্তীতে ভিসতারার সব কাজ সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন পলাশ ও তার তুখোড় দল। স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ তার স্থাপনা দিয়েই পুরোটা পরিচিত পেতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তি মুস্তাফা খালিদ পলাশ তার বাইরেও হাজার স্বপ্ন নিয়ে পথ চলেন। সুরের সাধনায় অথবা রংতুলির ছোপ ছাড়া এ জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান না তিনি। স্কুলপড়ুয়া থাকাকালীনই জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে তার একক চিত্রকলা প্রদর্শনী হয়। বাবা-মা ছিলেন শিল্পী, তার স্পষ্ট ছাপ পলাশের হাতের সূক্ষ্ম কারুময়তায়। একাধিক প্রকাশনাও রয়েছে তার চিত্রকর্মের। রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম রয়েছে তার, নিয়মিত অতিথি তিনি দেশীয় গানের অনুষ্ঠানগুলোতে। যন্ত্রানুষঙ্গেও তার ঝোঁক রয়েছে বেশ। প্রজন্মের স্থপতিদের এই আইকনের ছেলেবেলা কেটেছে বর্ণিল এক জগতে। বাবা-মা দুজনেই শিল্পী ছিলেন। বাবা যখন আঁকতেন, মুগ্ধ বিস্ময়ে পলাশ পাশে বসে থাকতেন, বাবা বন্ধুর মতো হয়ে গিয়েছিলেন তখন থেকেই। এমনও হয়েছে, বাবা ছক কেটে দিচ্ছেন, পলাশ একমনে তাতে রং ঢেলে যাচ্ছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাবাব কাঁধে চেপে দেখেছেন ঢাকার হুংকার, আর তাতে প্রতিবাদের নানা রং। একাত্তর খুব শৈশবে দেখা এই স্থপতির, বিজয় দিবসের কথা মনে আছে তার। কত উচ্ছ্বাস ছিল সেদিন বাবার মাঝে, মায়ের শাড়ি থেকে সবুজ, বোনের ফ্রক থেকে সোনালি রঙ আর চাদর থেকে লাল রঙের টুকরো নিয়ে পতাকা তৈরি করে কী আনন্দেই না বিজয় মিছিলে মেতেছিলেন তারা! শৈশবে এর চেয়ে আনন্দের স্মৃতি আর তার জন্য কী হতে পারে? ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসম্ভব গোছালো আর নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব। সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন বিষয়েই তিনি হতেন ক্লাসসেরা। সাঁকো নামে তারা একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন করেন। তিনি ছিলেন তার সম্পাদক, দেশব্যাপী বিস্তৃত ছিল তাদের কর্মযজ্ঞ। অনেক উত্সব আয়োজন হয়েছে তাদের হাত ধরে। শুধুই আয়োজন না, জাতীয় অনেক উত্সব আয়োজনের ট্রফি, পোস্টার ডিজাইনের কাজটাও করতেন তিনি। আজকের পলাশের মাঝেও সেই পাগলামিটা রয়েই গেছে, এখনও আনমনে নিজের স্কেচবুকের কোনায় এঁকে চলেন বিমূর্ত কোনো ছবি। স্থাপত্যের জগতে এই দীর্ঘ পথচলাটা আগলে রেখেছেন তার অর্ধাঙ্গী শাহজিয়া ইসলাম অন্তন, দুই ছেলে নৈঋত আর ঈষাণ তাদের দুজনের সব স্বপ্নের সারথী। যদিও মুস্তাফা খালিদ পলাশ সেই স্বপ্নে বিশ্বাসী নন, তিনি মনে করেন জেগে জেগেই তিনি স্বপ্নে বিভোর, তা পরিকল্পনাও হতে পারে। আর তা হলো স্বপ্নের দেশ গড়ার, স্বপ্নের আবাসন তৈরি করার। সম্প্রতি কলকাতাতে হয়ে গেল তার স্থাপত্যকর্মের উপর প্রদর্শনী ‘অ্যান আর্কিটেকচারাল ওয়াকথ্রু এমকে পলাশ’, তা কলকাতা তো বটেই, অন্যান্য শহরের সাড়া ফেলে বেশ। সার্থক এই মানুষটা জীবনে সফলতার দৌড় মাপতে যান না, যা হচ্ছে তাতে সার্থকতা পেলেন কতখানি, এটা নিয়েই মাঝে মাঝে ডুবে যান গভীর ভাবনায়। ক্লান্ত দুপুরে বিভোর হন সেই শৈশবের আঁকিবুঁকির স্মৃতিতে, তারই কী প্রভাব তার আজকের জীবনে? সবকিছু অস্পষ্টভাবে মনে আসে তার! বাস্তবিক আলো ঢেলেও সেই অস্পষ্টতা দূর করার নয়, সেখানে শুধুই অনুপ্রেরনার বীজ বোনা! মুস্তাফা খালিদ পলাশ ডাকনাম :পলাশ জন্ম তারিখ :১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৩ মায়ের নাম :আফরোজ মুস্তাফা বাবার নাম :কে এম জি মুস্তাফা প্রথম স্কুল :ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রিয় পোশাক :জিন্স, ফতুয়া। প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা আর আমার স্ত্রী অন্তন অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, গান গেয়ে অথবা ছবি এঁকে সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্য নয়, যেকোনো কাজের সার্থকতাটাই মুখ্য!