আমার বোন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। একদিন তাকে নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলাম। দেখলাম কিছু ছাত্রী পোশাকের আড়ালে হেডফোন নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকছে। কিছু শিক্ষার্থী ডেস্কের ভেতর মোবাইল ফোন লুকিয়ে রাখছে। বেশ কয়েকজন বাথরুমে বই ও শিট রেখে এলো। এবং কারো কারো অভিভাবক শিক্ষকদের ভয় দেখালো যেন শিক্ষকগণ তাঁদের ছেলেমেয়েদের সাহায্য করেন। ততক্ষণে আমার মধ্যে এ অন্যায় দেখে নিশ্চুপ থাকার যন্ত্রণা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এ লেখাটি হয়তো আমার দগদগে ঘায়ে সামান্য মলম লাগাতে পারে। এই নির্মম অসহায়তার মাঝে এইটুকুই বা কম কিসের? তাই লিখছি। যে দেশ স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিল সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার এই হাল হলো কেন?
পত্রপত্রিকায় দেখছি ফেসবুকের কিছু পেইজে পরীক্ষার আগের রাতে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। বন্ধুদের কেউ কেউ নাকি দেখছেও। একবার রাত ১০টায়, যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে অধ্যায়নরত এক ছোটভাই আমাকে মেসেজ দিলো তার কাছে পরের দিনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আছে। অসহায়ের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ভাবলাম আমার বোনের পরীক্ষার কী হবে?
এখানে শেষ নয়, শোনা যায় কিছু অসাধু ব্যক্তি বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্ন বের করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রিও করেছে। অবাক হলাম কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এজন্যে জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন না পদত্যাগ করলেন না । কিন্তু কর্তৃপক্ষকে এর দায় নিয়ে জাতির কছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে ভবিষ্যতে এ রকম প্রশ্নফাঁস আর হবে না।
প্রযুক্তির অপব্যবহারের সুযোগ নাগালে পেয়ে শিক্ষার্থীরা শুধু প্রশ্নফাঁস নিয়ে পড়ে থাকেনি। কিছু ছাত্রী হিজাব মাথায় জড়িয়ে, কানে হেডফোন দিয়ে বাইরে কল করে উত্তর সংগ্রহ করেছে। আমি যখন আমার বোনের জন্যে পরীক্ষার হলের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি, দেখলাম একটি মেয়ে গাছের নিচে বসে বই দেখে দেখে আরেকজন পরীক্ষার্থীকে মোবাইল ফোনে বলে দিচ্ছে। এরপর দেখলাম মোবাইল ফোনে বই দেখে টাইপ করছে। আমি জিজ্ঞেস করায় সে জানালো যে,তার পরীক্ষার্থী ভাইয়ের কাছে উত্তরপত্র পাঠাচ্ছে। পরীক্ষা শেষ করার পর আরেক জন ছাত্র বলেছে তার প্যারাগ্রাফ কমন পড়েনি তাই সে বাথরুমে গিয়ে গুগল সার্চ দিয়ে প্যারাগ্রাফ লিখেছে। এভাবে পরীক্ষায় প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। প্রতিকারের সুনির্দিষ্ট পথে এখনি হাঁটতে হবে। দেরি যা হবার তা হয়েছে।
৯-৪-১৪ তারিখের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে এক ছাত্রী আমাকে বলেছে—আজ পরীক্ষায় স্যার ক্লাসে পড়ানোর মতো করে উত্তর বলে দিলেন। এছাড়াও কিছু শিক্ষক তাঁদের প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের বুদ্ধি দেন যেন তারা অসুস্থতার ভান করে আলাদা পরীক্ষার হলে শুয়ে পরীক্ষা দেবার সুযোগ নেয় যাতে শিক্ষকগণের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা পেতে অসুবিধা না হয়। এভাবে কোনো কোনো শিক্ষক পুরো জাতির সঙ্গে আজ বিশ্বাসঘাতকতা করছে। এহেন পরিস্থিতিতে বার বার মস্তিষ্কে ঘুরে ফিরে আসছে একটি বাক্য—আমরা কি এই পাবলিক পরীক্ষা চেয়েছিলাম? যেমন বলেছিলেন হুমায়ুন আজাদ একটি বইয়ের শিরোনামে—আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
গোপালগঞ্জ
