নারায়ণগঞ্জের আলোচিত নূর হোসেনের ট্রাকের হেলপার থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া, প্রতিপক্ষ নজরুল ইসলামকে ঘায়েল করা এবং এর পর এলাকা থেকে নিরাপদ পলায়ন সবই হয়েছে প্রশাসনের সহযোগিতায়। গতকাল মঙ্গলবার সিদ্ধিরগঞ্জে গেলে এলাকাবাসী, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, বর্তমান পুলিশ প্রশাসন ও নিহতের স্বজনরা এই অভিযোগ করেন। তারা বলেন, এর জন্য শুধু একটি সংস্থা দায়ী নয়। অনেকগুলো প্রশাসন এর সঙ্গে জড়িত। সিদ্ধিরগঞ্জের ব্যবসায়ী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন প্রশাসনের কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, নূর হোসেন লেখাপড়া জানে না। ছিল ট্রাক চালকের হেলপার। মাত্র দেড় যুগেই জিরো থেকে সে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন হয়ে গেল। তারা অভিযোগ করেন, সে যে ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স পেল তা কিভাবে পেল। কাউকে অস্ত্রের লাইসেন্স দিলে এর আগে বিভিন্ন প্রশাসন তদন্ত করে। তারপর লাইসেন্স দেয়ার অনুমতি মিলে। অথচ সে সহজেই ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স পেল। এতে সহজেই প্রমাণ হয় নূর হোসেনের জন্য প্রশাসন উদার ছিল।
সাত হত্যাকাণ্ডের পর ওই লাইসেন্সগুলো বাতিল ও অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। এদিকে নিহতদের স্বজনরা বলেন, যারা পেশাদার কিলার নূর হোসেনকে অস্ত্রের লাইসেন্স দিল তারা কিভাবে এখনো প্রশাসনে বহাল আছেন।
কাঁচপুর সিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে বিলাসবহুল
অফিস খুলেন নূর হোসেন
ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইনসহ বস্তায় বস্তায় মাদক রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করত নূর হোসেন। অস্ত্র বেচাকেনা করত সে সীমান্ত থেকে কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকে করে মাদক এনে রাতে সিমরাইল বাস ভবনের পাশের দুই পুকুরে ফেলে রাখতো। পরে নূর হোসেনের ক্যাডার বাহিনী পুকুর থেকে মাদক তুলে মাইক্রোবাস ও বিভিন্ন যানবাহনে বিভিন্ন জায়গায় চালান পাঠাত। এই কাজে সংশ্লিষ্ট তিন পরিবহন শ্রমিক ও নূর হোসেনের চার প্রতিবেশি ইত্তেফাককে এই দৃশ্যের বর্ণনা করেন। তারা বলেন, প্রশাসনের লোকজন জড়িত না থাকলে প্রকাশ্যে কোটি কোটি টাকার মাদকের ও অস্ত্রের ব্যবসা কিভাবে করে নূর হোসেন? প্রতিদিন সিমরাইলের ট্রাকস্ট্যান্ড অফিসে এক শ্রেণির পুলিশসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিরা উেকাচ নিতে দেখেছেন তারা।
জানা গেছে, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা আদায় করত নূর হোসেন ও তার ক্যাডার বাহিনী। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে অবৈধ বালু, চুনার কারখানাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতো নূর হোসেন। ইটের ভাটা থেকে দৈনিক ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে নূর হোসেন। প্রশাসনের কাছে ব্যবসায়ীরা এসব অভিযোগ করলে উল্টা ব্যবসায়ীদের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সমাজ সেবক নূর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জীবন হারাবেন। এমন তথ্য জানিয়েছেন দুই ব্যবসায়ী। নূর হোসেনের পরিবহনের চাঁদাবাজি বন্ধে এক মন্ত্রী পর্যন্ত সোচ্চার হয়েছিলেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন নূর হোসেনের দোর্দন্ড প্রতাপে ঐ মন্ত্রী চুপ হয়ে যান। এমন তথ্য জানান পরিবহনের এক শ্রমিক নেতা।
নজরুলকে হত্যা করতে গিয়ে নূর হোসেনের ক্যাডার বাহিনীর হাতে আব্দুল মতিন ও রিকশা চালক শুকুর আলী নিহত হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে তাদের স্বজনরা সাহস পায়নি। পুলিশও নূর হোসেন ও তার ক্যাডারদের বিরুদ্ধে মামলা নিবে না বলে স্বজনদের জানিয়ে দেন। এ তথ্য জানিয়েছে স্বজনহারা পরিবার। তার শতাধিক কিলার প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ঘুরাফেরা করতো। তাও প্রশাসনের লোকজনের সামনে।
২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে ফতুল্লা শিবু মার্কেটে প্রকাশ্যে র্যাবের পোশাক পরিহিত লোকজন কাউন্সির নজরুল ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর পরই নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান নূর হোসেনই এ ঘটনার জন্য দায়ী বলে অভিযোগ করে।
অপহরণের পর থেকে নূর হোসেন সিমরাইলের বাসায় অবস্থান এবং দলীয় নেতাদের সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন। অথচ নূর হোসেনকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি। অভিযোগ করার ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত নূর হোসেন পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে ঘুরে বেড়ায়। তাকে ঐ সময় গ্রেফতার করলে হয়ত মানুষগুলো নিহত হত না, ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসত। সাত হত্যাকাণ্ডের একজন তদন্ত কর্মকর্তা এ সত্যতা স্বীকার করেন।
র্যাবসহ গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, নূর হোসেন পহেলা মে সীমান্ত পথে কলকাতা চলে যায়। অপহরণের পর ৫ দিন পর্যন্ত সে বাংলাদেশে ছিল। তাকে প্রশাসন বিদেশে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি এই সর্ম্পকিত সবগুলো বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি নূর হোসেনের অপরাধ জগতের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের কেউ জড়িত কিনা তাও শনাক্ত করার কার্যক্রম চলছে।
