ব্যস্ত মানুষদের কাছে কাজ আর বাইরের জীবনটাকে সাম্যাবস্থায় আনাটা অসম্ভব একটা কাজ বলেই মনে হয়। কাজের চাপে ঘর-সংসার সামলাতে হিমশিম খান তারা। অথচ তাদের মধ্যে বড় একটি দল রয়েছে যারা নিদারুণ ব্যস্ততার পরও ব্যক্তিগত জীবনটাকে সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। চাকরির পাশাপাশি নিজের ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত সময়ও তারা কাটাচ্ছেন ফুরফুরে মেজাজে। ব্যস্ত পেশাদার জীবন এবং বাকি অংশের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে উপায় খুঁজে বের করার জন্য এই লেখায় পাঁচটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন সানজিদা সুলতানা
সব কাজের কর্মী
স্টিফেন সোলেচার বোস্টনের সবচেয়ে ব্যস্ত হাসপাতালের একজন চিকিত্সক। তিনি নিজের একটি ব্যবসা গড়ে তোলার কথা ভাবলেন। এর জন্য তিনি নিজের চাকরিটি ছাড়লেন না। বরং ভালোমতো ব্যবসা করতে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হলেন। এমবিএ শেষ করে খুব দ্রুত তিনি নিজের ছোট একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে ফেললেন। এরপরই সন্তান নেওয়ার কথা ভাবলেন তিনি এবং ফুটফুটে একটি শিশুর বাবাও হলেন। নিজের চাকরি শেষে ব্যবসার খবর নিয়ে বাড়িতে বউ-বাচ্চাকে সময় দিচ্ছেন স্টিফেন। চাকরি ক্ষেত্রে সহকর্মীদের প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা দুটো মিলেই তিনি কাজগুলোকে ছকে এনেছেন।
বিশ্বভ্রমণকারী বিস্ময়কর নারী
৩৩ বছর বয়সী হানা লোরিং একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্লগার, মৌসুমী পর্যটক এবং গ্রাফিক ও ওয়েব ডিজাইন প্রতিষ্ঠানের গর্বিত মালিক। এসব কাজে শ্রম দিচ্ছেন এবং কিছু কৌশল অবলম্বন করছেন জীবনের বাকি অংশের জন্য। সেই ২০ বছর বয়সে ঘটনাক্রমে ২৪ হাজার ডলারের ঋণে পড়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই আজ এ অবধি এসেছেন। এই ঋণের জাল থেকে বের হতে তিনি ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার, বেবিসিটার, রেস্টুরেন্টের ওয়েট্রেস এবং দোকানের অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে টানা ১৮ মাস প্রতি সপ্তাহে ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা চাকরি করেছেন। ঋণ শোধের টাকা জমিয়ে নিজের সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে ভারতগামী প্লেনের ওয়ান ওয়ে টিকিট কাটেন তিনি। তখন থেকেই ভ্রমণের শুরু এবং যেখানেই যান সেখানেই তিনি হাউজ সিটার হিসেবে কাজ জোগাড় করে নেন। পরিচিত এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে গ্রাফিক ডিজাইনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানের কাজটি সহজেই করে ফেলেন।
পরিবারের দেখভাল করেও ব্যবসা পরিচালনা
৬৩ বছর বয়সী নারী মারিয়া রেকরুটের কথা শুনলে অবাক হবেন। এই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কানাডার ওন্টারিওতে বিনিয়োগ করেছেন। মা-বাবার দেখভাল তিনিই করতেন। মা মারা গেলে অশীতিপর বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনার জন্য ও ব্যবসার সমন্বয় করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে তার। তিনি নিজের অফিস নিয়েছিলেন যার মাধ্যমে ব্যবসার কাজ পরিচালনা করতেন। কিন্তু একাকী বাবার দেখাশোনার জন্য তিনি এখন বাড়ির কাছের একটি শপিং মলে তার ক্লায়েন্টদের সঙ্গে দেখা করেন। যখন ব্যবাসার কাজে কোনো মিটিংয়ে যোগ দিতে হয় বাবাকে নিজের সাথে ঘুরতে নিয়ে যান তিনি।
পরিশ্রমী যাদুকর
কিছু মানুষ তাদের পেশাজীবন এবং ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সমন্বয় করেন জাদুকরের মতো। তাদের মদ্যে ওয়েন হফম্যান একজন। তিনি একজন পেশাদার জাদুকর, একজন মেন্টালিস্ট এবং ইলুশনিস্ট। বছরের আট মাস তিনি বাইরে কাটান। একটি ক্রুজ শিপের চুক্তিবদ্ধ পারফর্মার তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত এবং অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখান তিনি। অন্যদিকে নিজের একটি প্রতিষ্ঠানও চালান হফম্যান, যার কাজ দুনিয়াজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য পারফর্মার বুকিং দেওয়া। তিনি নিজের একটি অলাভজনক সংগঠনও চালান যার নাম হফম্যান ফাউন্ডেশন। সবার মনোরঞ্জনের শেষে তিনি বাড়ি ফিরে সময় দেন একমাত্র মেয়েকে। হয়তো তিনিই বলতে পারবেন, এত কাজের পরও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও কাজের সন্ধান তিনি কেন করছেন?
কর্মী জুটি
কাজের সাথে অন্যান্য দায়িত্ব পালন বোধহয় সবচেয়ে সহজ সেই জুটিদের জন্য যারা দুজনই কাজ করেন। ইন্টার ব্রায়ান এবং বেথ হুইটফিল্ড দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এমন এক কর্মমুখী জুটি। তারা দুজন মিলে চার-চারটি প্রতিষ্ঠানের গর্বিত মালিক। তাদের রয়েছে দুটি চুল কাটার সেলুন, কনসাল্টিং ফার্ম এবং কয়েন ডিলারশিপ। এসব ব্যবসার মালিক হওয়ার আগে তারা দুজনই শিখছিলেন কীভাবে একজন আরেকজনের অভাব পূরণ করতে পারবেন।
ব্রায়ান কলেজ ডিগ্রি লাভের জন্য তিনটি পার্টটাইম চাকরি করতেন। বেথও তিনটি পার্টটাইমে যুক্ত ছিলেন। দুজন-দুজনের যত অভাব পূরণের দায়িত্ব নিতেন। কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে দুজনের প্রতি ভালোবাসা দুজনই উজাড় করে দিতেন।
বর্তমানে তাদের চারটি ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি ব্রায়ান আইয়োয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষকতা করছেন। একটি সাপ্তাহিক রেডিও শো-এর উপস্থাপনাও করেন তিনি। তাছাড়া লিখছেন একটি ডেইলি ব্লগে। দুটি সেলুনে পুরোদমে সময় দিচ্ছেন বেথ। তিনি ন্যাশনাল বিউটি এডুকেটর এবং বিভিন্ন ফ্যাশন শো, ইভেন্ট এবং ফটো শুটে বিউটিশিয়ানের কাজ করেন।
এই মহাব্যস্ত সময়ের মধ্যেও দুজনই সব সময় দুজনের সাথ সংযুক্ত আছেন এবং বাড়ি ফিরে সুন্দর সময় কাটাচ্ছেন।
