বাংলাদেশজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রাকৃতিক আর মনুষ্যনির্মিত দর্শনীয় স্থান। মূলত এই স্থানগুলোর কথা মাথায় রেখেই প্রতি শুক্রবারের আয়োজনে থাকছে একটি করে দর্শনীয় স্থানের বিবরণ। আর আজ এতে প্রকাশিত হলো ঈশ্বরদী জেলার নীলফামারীর নীলসাগর দীঘি-এর কথা।
দীঘির শান্ত আর নিরিবিলি পরিবেশ যাদের ভালো লাগে তাদের জন্য বেড়াতে যাওয়ার চমত্কার একটি স্থান হতে পারে নীলফামারী জেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত নীলসাগর দীঘি। সদর উপজেলার জিরো পয়েন্ট চৌরঙ্গী মোড় থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দীঘিটি মোট ৫৩.৯০ একর জমির ওপর অবস্থিত এবং জলভাগ ও চারদিকের পাড়ের জমির পরিমাণ যথাক্রমে ৩২.৭০ একর ও ২১ একরের মতো। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, বিরাট নামের এক বৈদিক রাজা এই দীঘিটি খনন করেছিলেন। সেই থেকে এই দীঘি কিছুকাল বিরাট দীঘি নামেও পরিচিত ছিল বলে জানা যায়। এ ছাড়া কালক্রমে এটি বিন্না দীঘি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নীলসাগর দীঘি নামেও পরিচিতি লাভ করে। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর কোনো এক সময়ে এই জলাশয়টির খননকাজ শুরু হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্রমতে, খ্রিস্টপূর্ব নবম হতে অষ্টম শতাব্দীতে পান্ডবরা কৌরবদের চক্রান্তের শিকার হয়ে যখন ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হয় তখন মত্স্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানীর এ স্থানটিতে ছদ্মবেশে বসবাস শুরু করেন। আর নির্বাসিত পান্ডবদের তৃষ্ণা মেটাতেই বৈদিক রাজা বিরাট এই দীঘিটি খনন করেছিলেন। বিরাট দিঘির অপভ্রংশ হিসেবে কালক্রমে এ দিঘিটি বিরাট দিঘি, বিল্টা দিঘি এবং অবশেষে বিন্না দিঘি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে ঐতিহাসিকদের অপর একটি দলের মত হলো, রাজা বিরাট তার বিশাল গরুর পালের জন্য পানির সংস্থান করতেই এ দিঘি খনন করেন এবং তার কন্যা বিন্নাবতীর নামে এর নামকরণ করেন বিন্না দীঘি। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে নীলফামারীর তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক এই দীঘিটিকে পর্যটনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং নীলফামারীর নামানুসারে বিন্না দিঘির পরিবর্তে এর নামকরণ করা হয় নীলসাগর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই মূলত নীলসাগর বিখ্যাত। মনোরম এই দীঘিটির পাড় ঘিরে রয়েছে নারকেল, বনবাবুল, আকাশমণি, মেহগনি, শিশুসহ নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ। এ ছাড়া শীতকালে এই দীঘি এলাকায় দেখা মেলে রাজহাঁস, মার্গেঞ্জার, মাছরাঙা, ভুবনচিল, সবুজ চান্দি ফুটকি এবং বাচাল নীল ফুটকিসহ অসংখ্য অতিথি পাখির। নীলসাগর দীঘি এলাকাতে প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায় বারুণী স্নান উত্সবের আয়োজন করে থাকে। এ ছাড়া পর্যটকদের সুবিধার্থে দীঘির পাশেই সরকারের অনুদানে নির্মিত একটি রেস্টহাউজ এবং ছোট একটি পার্কও রয়েছে।
